সোমবার, ১২ মে, ২০১৪

বাংলা লেখা কেমন হবে- দুই--২০১২


বাংলা লেখা কেমন হবে-- দুই--২০১২


বাংলাভাষা সমিতির পত্রিকা “বাভাস”
সেখানে এই লেখাটি জুন ২০১১ থেকে 
ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে৤
সেটিই এখানে আপলোড করা হল৤  





সবটা ঠিক মতো পড়তে হলে ফন্ট ফ্রি ডাউনলোড করুন এখানে ক্লিক করে:--







সঙ্গে দেওয়া ফাইল দেখে নিতে হবে৤

অহনলিপি-বাংলা১৪ ডিফল্ট টেক্সট ফন্ট সেটিং
(AhanLipi-Bangla14 Default text font setting)
Default text font setting ডিফল্ট টেক্সট ফন্ট সেটিং

এবং

অহনলিপি-বাংলা১৪ ডিফল্ট ইন্টারনেট সেটিং
(AhanLipi-Bangla14 Default Internet setting)

(Default font setting ডিফল্ট ফন্ট সেটিং)

on internet(Mozilla Firefox)
(top left) Tools  
              Options > contents
              Fonts & Colors
              Default font:=AhanLipi-Bangla14
                        Advanced...
                                    Fonts for: =Bengali
                                    Proportional = Sans Serif,   Size=20
                                    Serif=AhanLipi-Bangla14
                                    Sans Serif=AhanLipi-Bangla14
                                    Monospace=AhanLipi-Bangla14,  Size=20
                                    -->OK
            Languages
            Choose your preferred Language for displaying pages
            Choose
            Languages in order of preference
            Bengali[bn]
            -->OK
  --> OK

          এবারে ইন্টারনেট খুললে ‘অহনলিপি-বাংলা১৪’ ফন্টে সকলকিছু দেখা যাবে৤ নেটে একই ফন্টে সব কিছু লেখাও যাবে৤






 বাংলা লেখা কেমন হবে-- দুই--২০১২

বাভাস  



              ফেব্রুয়ারি-২০১২  
 


বাংলা লেখা কেমন হবে
মনোজকুমার দ. গিরিশ 
পর্ব-৩

   এ লেখা অতি সংক্ষেপে লিখতে হচ্ছে৤ স্থান-সংক্ষেপ বলে বিস্তারিত লেখার সুযোগ নেই৤ তাই সব ব্যাপার হয়তো ব্যাখ্যায় স্পষ্ট হবে না৤ পাঠকেরা তাঁদের প্রশ্ন এবং মূল্যবান পরামর্শ জানালে সাধ্যমতো জবাব দেবার চেষ্টা করব৤ 




সবার উপরেরটি বাংলা ডিজিটাল হরফে, পরেরটি ডোরা বর্ণে, নীচেরটি বাংলা চারুবর্ণে লেখা৤ শব্দটি হল ”বাংলা“৤ সবই বাংলা ইনজিনিয়ারিং বর্ণমালাকে ভিত্তি করে গঠিত হরফ৤   






       
          বাংলার হরফ গঠন সরল হলে এমনি বিচিত্র আরও নানা গঠনের হরফ তৈরি করা যাবে৤ ইংরেজিতে হাজার খানেক বিচিত্র সব হরফ গঠন আছে, বাংলায় নেই প্রকৃতপক্ষে একটিও৤ তার কারণ, বাংলা লিপি হল কমপ্লেক্স স্ক্রিপ্ট৤ আর তাছাড়া, বাংলা লিখতে গেলে নানা বিচিত্র স্বরচিহ্ণ ও ব্যঞ্জনচিহ্ন তথা ফলা ব্যবহার করতে হয়৤ এসব সরল করতে পারলে বাংলা লিপিও সহজ ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠবে৤ ইংরেজি হরফ পাশাপাশি বসিয়েই লেখালিখি চলে, বাংলায় সেটা সম্ভব নয়৤ যদি ভাষা ও বানান সংস্কার করে নতুন বানান পদ্ধতিতে কখনও বাংলা লেখা যায় তবে বাংলাও ইংরেজির মতো হরফ পাশাপাশি বসিয়ে অনায়াসে লেখা চলবে৤ তখন বাংলা লেখাও ইংরেজির সমকক্ষ হয়ে উঠবে৤


        ভাষা হল জীবন ও জীবিকার মূল হাতিয়ার৤ সেই হাতিয়ারকে যদি আমরা সহজ সরল অনায়াস করতে পারি তবে তা আমাদের জীবিকারও সহজ সুরাহা করতে পারবে৤  

ভাষা এবং তার লিখন-পদ্ধতি হল একটি অলিখিত সামাজিক রীতি৤ এটি কোনও অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক নিয়ম নয়৤  তাই, যদি তা সহজ ও সরল করার চেষ্টা করা হয় তবে সে চেষ্টাকে পৃষ্ঠপোষণ দেওয়া দরকার৤ 
          বাংলা ভাষা ও লিপির ব্যাপক প্রসার প্রচার ঘটাতে হলে বাংলা লিপির গঠন যতটা সম্ভব সহজ সরল করতে হবে৤ রোমান লিপির এত ব্যাপক প্রসারের মূল কারণটিই হল তার অবিসম্বাদিত সারল্য৤ বাংলা লিপি সেই সারল্য অর্জন করুক৤ বাংলা লিপির স্বাভাবিক সৌন্দর্য বিশ্বজনের মনকে আকৃষ্ট করে৤ ইংরেজিভাষী এক তরুণ বাংলা লিপির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আগ্রহী হয়ে বাংলা শিখেছে৤ সেই মুগ্ধতাকে যদি সরলতা দিয়ে ঋদ্ধ করা যায় তবে তা আপন বেগেই বিশ্বমনকে আপ্লুত করবে প্রাকৃতিক অনায়াস গতিতে৤





    এপ্রিল-২০১২    
বাভাস

বাংলা লেখা কেমন হবে
মনোজকুমার দ. গিরিশ 
পর্ব-৪
          “নেতি” লিখতে কলম না তুলে শব্দটি একটানে লেখা যায়৤ তেমনি “খণ্ড” লেখা যায় একটানে কলম না তুলে৤ এই যে time economy & labour economy তার মূল্য কম নয়৤ আবার এতে বোধ্যতায় ঘাটতি হয় খুবই, তার মূল্য চোকানো আরও কঠিন৤ কিন্তু প্রথমে “নেতি” শব্দে চার বার এবং “খণ্ড” শব্দে চার বার চাবি টিপতে হয়, কম্পিউটারে প্রতিটি চিহ্ন “‌ে ন ি ত” এবং “খ ণ‍ ্ ড” -- টিপতে হয় এতে time এবং labour বেশি লাগে, সাশ্রয় কমে যায়, কিন্তু বোধ্যতায় তা সকল মূল্য চুকিয়ে অনেক বেশি গ্রাহ্য এবং অভীষ্ট হয়ে ওঠে৤  ‌
          দুটি শব্দের ক্ষেত্রেই যদি চার বার করে চাবি টিপতে হয়, সেখানে যদি লেখায় স্পষ্টতা অনেক বেশি বাড়ে, তবে কেন তা না-করে আমরা প্রায় হাতে লেখার কায়দায় হরফের মণ্ড করে লিখব? দলা পাকানো বা হরফ-মণ্ড করে লিখতে সুবিধে হয় হাতে করে লিখতে গেলে-- টাইপ করে লেখার ক্ষেত্রে তেমন কোনও  সুবিধে নেই৤ আর তা যদি না থাকে তবে আরও বেশি স্পষ্ট করে কেন লেখা হবে না? যোজিত হরফের একটি আর-একটির ঘাড়ে চাপিয়ে, এবং অনেক ক্ষেত্রে দলা পাকিয়ে লেখার যুক্তি কী? প্রথম যখন বাংলা ছাপার টাইপ তৈরি হয় তখন বেশ স্বচ্ছ রীতিতে তা করা হয়েছে





    পরবর্তীকালে তা দলা পাকিয়ে হাতের লেখার কাছাকাছি আনা হয়েছে৤ এটা বাংলা টাইপ নির্মাতাদের ভ্রান্তি৤ জড়িয়ে পেঁচিয়ে দলা করে টাইপ করলে/ছাপলে জায়গা কম লাগে, এটা একটা আপাত লাভ বটে তবে তা শেষ অবধি লাভের ঘরে না থেকে লোকসানের খাতা ভারী করে৤
          যদি ইংরেজি লেখার মতো রোমান লিপির পদ্ধতিতে বাংলা লেখা যেত তাতে ৪০%শতাংশ জায়গা কম লাগত, আর বাংলা বর্ণের যুক্তগঠন নিয়ে টাইপ নির্মাতাদের গলদঘর্ম হতে হত না৤ কারণ বাংলায় ঠিক কয়টি যুক্তবর্ণ আছে কিংবা সেগুলির মধ্যে কয়টি মণ্ড হরফ তার কোনও স্পষ্ট হিসেব নেই৤ অনেকটা আন্দাজে সে কাজ সারতে হয়৤ ফলে যখন কোনও বিদেশি বা বহিরাগত শব্দে নতুন যুক্তবর্ণ গঠন করার দরকার হয়, তখন ফ্যাসাদ বাঁধে৤ আনন্দবাজার পত্রিকা ভ+ল যুক্তবর্ণ করতে গিয়ে নতুন একটি বিদঘুটে মণ্ডহরফ তৈরি করেছে৤ যদি তা স্বচ্ছ রীতিতে করা যেত তবে ভ+ল=ভ্ল লেখায় কোনও সমস্যাই দেখা দিত না৤ এই রীতি এতই উন্মুক্ত/সহনশীল(flexible) যে ভবিষ্যতে এ ধরনের আগত যুক্তবর্ণ/যুক্তধ্বনি গঠনে কোনও সমস্যাই হবে না৤
          বাংলায় অনুসন্ধান করে অন্তত ৩৯৫টি যুক্তবর্ণ পাওয়া গেছে, এবং এর বাইরে বেশ কয়েকটি যুক্ত হরফের ফন্ট(৭টি) এখন আর ব্যবহার করা হয় না৤ যেমন ব+ঢ=ব্ঢ ইত্যাদি৤ বর্ণের ক্ষেত্রেও যেমন দেখা গেছে স্বরবর্ণ ঌ (লি) এখন আর ব্যবহার্য নয়৤
          স্বচ্ছ যুক্তবর্ণ পদ্ধতিতে মাত্র দুটি মণ্ড হরফ থাকবে-- ক্ষ, জ্ঞ৤ কারণ এদের বিশ্লিষ্ট করে লিখলে উচ্চারণগত সংকট দেখা দেবে৤ এটা অবশ্য এখনকার মতো ব্যবস্থা, পরে বাংলা ”নতুন-বানান“ ব্যবস্থায় এদুটি আর এভাবে রাখার দরকার হবে না৤
    বাংলায় অর্ধবর্ণ তথা অর্ধব্যঞ্জন বর্ণ চারটি--
ৎ ং ঃ ঁ এগুলি হল ত > ৎ , ঙ > ং, হ > ঃ, ন > ঁ৤ তাই এদের ধারাবাহিকতা বা সজ্জা হওয়া উচিত-- ঙ=ং,ত=ৎ ,ন=ঁ, হ=ঃ অর্থাৎ ং ৎ ঁ ঃ৤ প্রয়োগ--বাঙলা=বাংলা,হঠাত্=হঠাৎ ,চান্দ=চাঁদ,   বাহ্=বাঃ৤ এই অর্ধব্যঞ্জনগুলি বর্ণমালার শেষ ভাগে থাকে, তবে এর সজ্জা সব সময়ে খুব সুনির্দিষ্ট নয়৤এক-এক বইয়ে এক-এক রকম করে সাজানো হয়, যেমন-- ৎ য় ং ঃ ঁ৤যদিও এদের মাঝে য় বসা উচিত নয়৤ কারণ ড > ড় , ঢ > ঢ়, য > য়৤ এই বর্ণগুলির (ড়ঢ়য়) সৃষ্টি বিদ্যাসাগরের হাতে৤ তিনি বলেছেন-- “ড ঢ য এই তিন ব্যঞ্জনবর্ণ, পদের মধ্যে অথবা পদের অন্তে থাকিলে, ড় ঢ় য় হয়;ইহারা অভিন্ন বর্ণ বলিয়া পরিগৃহীত হইয়া থাকে৤ কিন্তু যখন আকার ও উচ্চারণ উভয়ের পরস্পর ভেদ আছে, তখন উহাদিগকে স্বতন্ত্র বর্ণ বলিয়া উল্লেখ করাই উচিত;এই নিমিত্ত, উহারাও স্বতন্ত্র ব্যঞ্জনবর্ণ বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছে৤” (বর্ণপরিচয়, প্রথমভাগ, ১৮৫৫ খ্রিঃ)৤ 
          বাংলা বর্ণমালায় আমরা একটি বর্ণবহির্ভূত চিহ্ন ব্যবহার করি, তাহল-- ্(হস) চিহ্ন৤ বর্ণের অন্তর্নিহিত(inherent) অ-ধ্বনি অপসারণ করার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়৤ বাংলা সকল বর্ণে উচ্চারণের সুবিধার জন্য অ-ধ্বনি প্রয়োগ করা হয়, নয়তো ক আসলে ক্, খ=খ্, গ=গ্ ইত্যাদি, যা উচ্চারণ করা দুরূহ৤
          বাংলা ‘নতুন-বানান’ নিয়ে দু-একটি কথা পরে বলা যাবে সময় হলে৤ কারণ সেই ধারণা প্রচলিত রীতি নয় বলে লোককে জোর ধাক্কা দেবে৤ তাই তার জন্য মানসিক প্রস্তুতি দরকার৤ যদিও তা বাংলাভাষার বিকাশের সহায়কই হবে৤ 












    জুন-২০১২   
 বাভাস


বাংলা লেখা কেমন হবে 
মনোজকুমার দ. গিরিশ

পর্ব-৫

একটি কবিতা আমরা সবাই জানি--


ওঠ শিশু মুখ ধোও পর নিজ বেশ,

আপন পাঠেতে মন করহ নিবেশ৤ 


এই কবিতাটি যদি একটু অন্য রকম করে বলা হয়, তবে বোধ করি তা আরও ভালো হয়,


ওঠো শিশু মুখ ধোও পর নিজ বেশ,

খেয়েদেয়ে পাঠে মন করহ নিবেশ৤


শিশু ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়েই পড়তে বসবে, এই চিত্রের চেয়ে বরং সে-- খেয়েদেয়ে পড়তে বসবে, এই চিত্র অনেক শোভন এবং সুন্দর৤ 


          তেমনি বাংলা লেখা কোনওখানে যদি একটু অন্যরকম করলে আরও শোভন, আরও  সুন্দর হয়, তবে আমরা সেটাই করব৤ সে ব্যাপারে কোনও অকারণ মানসিক প্রতিরোধ তৈরি করা ঠিক হবে না৤ আমরা কবিকে অস্বীকার করছি না, নস্যাৎ করে দিচ্ছি না, কেবল সামান্য অন্যরকম করছি যেটা বে-খেয়ালে এতদিন করা হয়নি৤ তবে কবির উপরে খবরদারি করা হচ্ছে কিনা তা  নিয়ে কথা উঠবে৤ সে তো রেল লাইন সোনা দিয়ে বাঁধাই করে দিলেও প্রশ্ন উঠবে তা চুরি হবার সংকট বাড়বে কিনা? এ বিতর্ক চলতে থাকবে৤ বরং তর্ক তার ডালপালা ছড়িয়ে এক সময়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাবে, মূল বিষয়টিই তখন আর কারও মনে থাকবে না৤ অবশ্য বাঙালি তর্কপ্রিয় জাতি হলেও যুক্তিশীল জাতিও বটে৤ শেষ ভরসা যে সেটাই৤ 


          একালে ঌচু(অর্থাৎ লিচু) লিখলে শিশু হয়তো বেত এবং কানমলা খাবে, কিন্তু এককালে তো সেটাই বিহিত ছিল৤ কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত সময়ে(গত একশো বছরে) বাংলা লেখা থেকে ঌ(লি) কখন আপনিই বর্জিত হয়ে গেছে তা কেউ টেরই পাননি৤ এখনও বাংলা শিশু-শিক্ষার বইয়ে মৃত সে লিপির উপস্থিতি দেখি৤ সে লিপির জন্য শোক করে লাভ নেই, বরং সহজ হওয়াতে আনন্দ আছে৤ সেই আনন্দ উপভোগ করতে হবে৤ ভয়ে সিঁটিয়ে থেকে আনন্দ নয়, বরং রীতিমত বুক ফুলিয়ে আনন্দ৤  


          এর আগেও নিজের ঢাক অনেক পিটিয়েছি আর একটু পেটানো যাক৤ নিজের ঢাকের বাদ্যি তো নিজের খুব ভালো লাগে, যদিও অন্যের কানে তা বড়ই কর্কশ মনে হয়৤ বিজয়নগর হাই স্কুলের শিক্ষক দক্ষ নাট্য উপস্থাপক বন্ধুবর স্বপন বিশ্বাস একবার হাজরা মোড়ে সুজাতা সদন মঞ্চে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি চমৎকার নাটক মঞ্চস্থ করেন৤ নাটকটির মৌলিক উপস্থাপনা এবং পরিবেশনগত সাহস চমকিত করার মতো৤ নাটকের শুরুতে তাঁরা মঞ্চে আমাকে এবং অন্য একজনকে সংবর্ধনা দেন আমার কাজগুলির স্বীকৃতি স্বরূপ৤ তখনও অবশ্য আমি বাংলা ইউনিকোড ফন্ট তৈরি করিনি৤ তখন তৈরি করেছিলাম নন-ইউনিকোড ফন্ট৤ দুটো রীতির ফন্টই ব্যবহার যোগ্য৤ তবে ইউনিকোড ফন্ট হল সর্বান্তিক ফন্ট এবং আন্তর্জাতিক মানের৤ ”বাংলা লেখা কেমন হবে“-- এই দীর্ঘ রচনাটি প্রধানত স্বপনবাবুর উৎসাহেই ধারাবাহিকভাবে লেখা চলছে৤ ইন্টারনেটে আমার কয়েকটি ব্লগ আছে, সেখানে বাংলাভাষা বিষয়ক  একাধিক এমনি রচনা দেখা যাবে৤  


          ইউনিকোড ফন্ট এবং নন-ইউনিকোড ফন্ট নিয়ে দু-একটি কথা বলা যাক৤ ফন্ট হল-- হরফসমূহ, যা ছাপার কাজে ব্যবহার করা হয়৤ কম্পিউটারে লেখার হরফসমূহকেও একত্রে ফন্ট বলে৤ ইউনিকোড, নন-ইউনিকোড দুটি প্রকৃতির ফন্টেরই বাইরের গঠন একই, তফাৎ কিছুই বোঝা যাবে না৤ এদের ভিতরকার কারিগরি প্রকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন৤ একের সঙ্গে অন্যের কোনও মিল নেই৤ নন-ইউনিকোড ফন্টে বাংলা এবং অন্য সকল (ভারতীয়, অভারতীয়) কমপ্লেক্স স্ক্রিপ্ট ছিল সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল৤ এখন ইউনিকোড ফন্ট তৈরি হয়ে সেই পরনির্ভরশীলতা কেটে গিয়ে বাংলা সহ সকল ভাষাই স্বাধীন এবং মুক্ত হয়েছে৤ 


          কম্পিউটারে লেখা তথা হরফ আসলে কতকগুলি কোড নির্ভর চিহ্ন৤ নয়তো এতগুলি হরফ বা চিহ্ন তো কম্পিউটার কিবোর্ডে নেই৤ নানা কৌশলে তা লেখার ব্যবস্থা করা হয়৤ এতদিন ইংরেজি কোডকে ধার করে বাংলা লেখা হত৤ পরে আন্তর্জাতিক ”ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম“ তৈরি হওয়াতে, তাঁরা বিশ্বের সকল ভাষার প্রতিটি হরফের জন্য একটি করে কোড নির্ধারণ করায়, সকল ভাষা এখন মুক্ত হয়ে স্বাধীন হয়েছে৤ বাংলাভাষাও এখন মুক্ত ও স্বাধীন৤ এই মুক্তিকে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগাতে তাই আমরা ইউনিকোড ফন্টকে কাজে লাগাব৤ এই ফন্ট দিয়ে যেসব কাজ করা যায়, আগে তা  করাই যেত না৤ সেই সুবিধাকে বর্জন করার তাই কোনও কারণ নেই৤ বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও তা আগের চেহারাকে ধরে রাখার পক্ষে সুবিধাজনক হয়েছে, অথচ কাজটা করা যাচ্ছে অতি আধুনিক উপায়ে, সেটা তো দোষ নয়, বরং বিরাট গুণ৤ সুতরাং ইউনিকোড ব্যবহারে তৎপর হতে হবে৤ বাংলা হরফে সরাসরি ইমেল করা যাবে, বাংলা হরফে ওয়েব সার্চ করা যাবে, সর্টিং, টেক্সট সার্চ করা যাবে৤ বাংলা হরফে ওয়েব পেজ তৈরি করা যাবে৤ ইউনিকোডের এক ফন্ট থেকে অন্য ফন্টে পরিবর্তন করা যাবে৤ ওয়েব পেজ দেখা যাবে নিজের ইচ্ছে মতো সেট করে দেওয়া ফন্টে৤ এসকল সুবিধাদি কেবলমাত্র সর্বান্তিক ইউনিকোড ফন্টেই পাওয়া যাবে৤ চালু নন-ইউনিকোড ফন্ট ক্রমেই অচলিত হচ্ছে, সেটা মনে রাখা দরকার৤

                   





       আগস্ট-২০১২     
বাভাস


বাংলা লেখা কেমন হবে
মনোজকুমার দ. গিরিশ 

পর্ব-

          শব্দের থাকে তিনটি স্তর৤ সকল ভাষাতেই তেমন দেখা যায়৤ ১৤মূর্ত, ২৤অর্ধমূর্ত, ৩৤বিমূর্ত৤ যেসকল জিনিস ধরা ছোঁয়া যায়, দেখা যায় তেমন জিনিসের নাম হল মূর্ত শব্দ৤ যেমন-- চোখ, হাত, পা মুখ, ঝিঙ্গে, পটল৤ আর যে জিনিস, তেমনভাবে স্পষ্ট নয়, তাকে বলে অর্ধমূর্ত শব্দ৤ পিসে, জামাই, রাঙাদি, দুলাভাই৤ এরা প্রায়মূর্ত শব্দ, কিন্তু ততোটা মূর্ত নয়, শিশুদের শেখাতে গেলে সেটা বেশ বোঝা যাবে৤ পিসে বা জামাই যে কী তা তাদের কাছে তেমন  সহজবোধ্য নয়৤ তেমনি আছে বিমূর্ত শব্দ৤ যা দেখা বা ধরা ছোঁয়া যায় না৤ শিশুদের শেখানো যাবে না৤ যেমন  -- কোমল, পেলব, লাবণ্য, স্নেহ, কৌশল, ধূর্ত৤  


          যেভাষায় বিমূর্ত শব্দের আধিক্য সে ভাষা বেশি সমৃদ্ধ৤ কারণ বিমূর্ত ভাব প্রকাশে তা সহায়তা করে৤ মাতৃভাষীর কাছে যার অনুভব বেশি, বিদেশিরা সে শব্দ তেমন সহজে বুঝে উঠতে পারেন না৤ এসকল শব্দের অনুবাদও বেশ কঠিন৤ বাংলায় যেমন আছে অভিমান, ইংরেজিতে নাকি এর কোনও প্রতিশব্দ নেই৤ অথচ অভিমানহীন বাঙালি দেখা যায় না৤ হয়তো দেশীয় জলহাওয়া এর একটা বেশ বড় কারণ হতে পারে৤ নরম পলিপরিবেশ, বৃষ্টিস্নাত ধরণী এবং স্নিগ্ধ সবুজ সমারোহের প্রভাব তো মানব মনে থাকবেই৤ 


          আমরা যে সংখ্যা গণনা করি ১ ২ ৩...৯ ১০, সেখানে একটা জিনিস লক্ষ্য করার মতো, তা হল সংখ্যার শুরু কোন্ সংখ্যা থেকে? ১ থেকে কি? না অন্য কিছু থেকে? সংখ্যা গণনা শুরু হবে ০ শূন্য থেকে, ১ এক থেকে নয়৤ সংখ্যা স্তম্ভ দেখলেই তা স্পষ্ট হবে--


৩০       ৪০       ৫০       ৬০      ৭০       ৮০

৩১       ৪১       ৫১       ৬১       ৭১       ৮১

৩২      ৪২      ৫২      ৬২      ৭২      ৮২

৩৩      ৪৩       ৫৩      ৬৩      ৭৩       ৮৩

...

৩৮      ৪৮      ৫৮      ৬৮      ৭৮      ৮৮

৩৯      ৪৯       ৫৯      ৬৯      ৭৯       ৮৯


          এখানে দেখা যাবে সংখ্যার পরবর্তী স্তম্ভ শুরু হচ্ছে ০ শূন্য দিয়ে৤ অর্থাৎ সংখ্যা গণনা করতে হবে ০ শূন্য থেকে, কখনও ১ থেকে নয়৤ যদিও টাইপরাইটারে বা কম্পিউটার কিবোর্ডে ০ শূন্য সংখ্যার কি(key) শেষেই থাকে৤ 


          বাংলা সংখ্যা গণনায় কিছু ত্রুটি আছে৤ উনসত্তর, বা উনআশি বললে সংখ্যাটি ঠিক কত তা একটু ভেবে বুঝতে হয়, এটা ছয়~নয়, নাকি সাত~নয়, তা একটু ভেবে ঠিক করে নিতে হয়, এটা ছয়~নয়,(৬৯), হ্যাঁ এটা সাত~নয়(৭৯)৤ ইংরেজি সংখ্যা গণনায় কিন্তু এই বিভ্রান্তি নেই৤ এটা সিক্সটি নাইন(69), সেভেনটি নাইন(79)৤ বাংলায় এই স্পষ্ট রীতি প্রয়োগ করা দরকার৤ ৬৮ আটষট্টির, পরে তা নয়ষট্টি(৬৯) হওয়া উচিত, উনসত্তর নয়৤ তেমনি আটাত্তর বলার পরে নয়সত্তর(৭৯) বলা দরকার৤ তাই বাংলা সংখ্যা গণনার রীতি একটু পালটানো দরকার, যাতে সংখ্যাটি বললে সঙ্গে সঙ্গে তা  বোঝা যায়৤ বলার সময়ে সংখ্যার বোধ যত সহজে মনে ধরা দেবে, তা ততোই ভালো৤ আগে থেকে কী চলে আসছে, তার চেয়ে কোন্‌টা বেশি যুক্তি সংগত সেদিকে নজর দিতে হবে৤ যেকোনও ক্ষেত্রে অগ্রগতি এভাবেই হয়৤ বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে এধরনের ছোট ছোট কাজ করে বাংলাভাষার ভিত আরও দৃঢ় করতে হবে৤ 


বাংলা সংখ্যা চার ৪ হল দক্ষিণাবর্তী  






আর ইংরেজি সংখ্যা এইট 8 হল  বামাবর্তী






 আমরা কিন্তু বাংলা সংখ্যা চার লিখি ইংরেজি সংখ্যা আটের মতো বামাবর্তী করেই৤ প্রাচীন কালে অবশ্য সংখ্যা চার ৪ বামাবর্তী করে লেখার চলও ছিল৤  


          একটা প্রশ্ন যদি করা যায় যে, বাংলায় শব্দ সংখ্যা কত? তবে সমস্যায় পড়তে হবে৤ কোনও ভাষার সঠিক শব্দ সংখ্যা অবশ্য নিখুঁত করে বলা সম্ভব নয়, তবু তার একটা মোটামুটি হিসেব তো থাকবেই৤ বাংলার শব্দ সংখ্যা এক লক্ষ, না এক কোটি তা কে বলবেন? 


          বাংলায় যে প্রধান অভিধানগুলি আছে তা হল, (১)হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত ”বঙ্গীয় শব্দকোষ“ (১৩৪৮/১৯৪১)৤ (২) জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস সংকলিত ”বাঙ্গালা ভাষার অভিধান“(১৯৩৭)৤ এগুলি থেকে হিসেব করে বাংলা ভাষার শব্দ সংখ্যা মোটামুটি দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় লক্ষ৤ তবে বাংলা যেহেতু একটি সজীব এবং পরিবর্তনশীল ও গড়ে উঠতে থাকা ভাষা তাই তার শব্দ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে৤ ৫০ বছর পরে দেখা যাবে বেশ কিছু নতুন শব্দ বাংলায় তৈরি হয়েছে, বা অন্য ভাষা থেকেও  এসেছে৤ আগেও তা হয়েছ, ভবিষ্যতেও তা হবে এতে কোনও সন্দেহ নেই৤ কিছু তার অবশ্য সময়ের সরণে বাতিলও হয়ে যাবে৤  

                



   অক্টোবর-২০১২  
 বাভাস

বাংলা লেখা কেমন হবে
মনোজকুমার দ. গিরিশ 

পর্ব-

          বাংলা ভাষায় যুক্তবর্ণ যে এক জটিল আবস্থার সৃষ্টি করে তা আমরা পদে পদে দেখি৤ সহজে এবং সুস্থভাবে এসব আয়ত্ত করা যায় না৤ বাংলা বর্ণমালা শেখা যদি কঠিন না হয়, তবে তা লেখায় এত জটিলতা হবে কেন? আসলে জটিলতা প্রধানত তার যুক্তবর্ণ লেখার কুটিল কাণ্ডে৤ আ-কার, ই-কার ইত্যাদি যদিও তার বর্ণরূপ থেকে পৃথক তবু তার সংখ্যা মোটে দশটি বলে তা আয়ত্ত করা ততোটা অসুবিধাজনক নয়৤ কিন্তু শত শত যুক্তবর্ণ বাংলা-শিক্ষার্থীকে বিভ্রান্ত করে দেয়৤ ফলা এবং যুক্তবর্ণ আদতে একই জিনিস ব্যবহারিক কারণে এদের নাম পৃথক হয়েছে৤ ণ, ন, ম, য, র, রেফ, ল, ব--এই আটটির ব্যবহার খুব বেশি, তাই এদের এক-একটি বিশেষ রূপ দিয়ে নতুন অভিধা দেওয়া হয়েছে-- ফলা৤ অবশ্য এদের মধ্যে ণ-ফলার ব্যবহার কম৤হয়তো অতীতে এককালে এর ব্যবহার বেশি ছিল৤  

          সে যাহোক, শিশুশিক্ষার বই দেখলে বোঝা যাবে যে তার লেখকেরা কী উপায়ে যে শিশুদের যুক্তবর্ণ শেখাবেন তা নিয়ে খুবই বিচলিত৤ ভাষাবিদ একজন পন্ডিত বলেছিলেন, আমরা ছেলেবেলায় বেত আর কানমলা খেয়ে এসব শিখেছি এরা পারবেনা কেন? কথাটা যত সহজে বলা যায় শিশুদের যুক্তবর্ণ শেখাতে গেলে বোঝা যায় তার প্রকরণ, পদ্ধতি নিয়ে লেখকেরা নিজেরাই বিচলিত৤ শিশুদের তা বোঝানোই তো কঠিন কাজ৤ অবশ্য বেত নিয়ে বসে কোন প্রশ্ন ছাড়াই তাদের রপ্ত করতে বাধ্য করলে হয়তো সমস্যা সহজ হয়, কিন্তু লেখকের পক্ষে তাদের বোঝানো সহজ নয়৤ কিছুদিন আগে শিশুদের এক পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে--”বইটি শিশুসাহিত্যে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে৤ এটি লেখা হয়েছে শিশুদের জন্যে যত্ন করে ও যুক্তাক্ষর বর্জিত করে৤-- আনন্দমেলা, ১৬/০৩/১৯৮৮“ [কানাইলাল চক্রবর্তীর শিশু পাঠ্য ’চলো দেখে আসি‘৤]

           যুক্তাক্ষর বা যুক্তবর্ণ বাংলাভাষায় এমন একটি কঠিন সমস্যা যে তা কেবল শিশুদের কাছে কঠিন এবং দুর্বোধ্য নয়, তা বয়স্কদেরও শৈশব পার হতে দিতে চায় না৤ শিক্ষিত ব্যক্তিও সব যুক্তাক্ষর নিশ্চিতভাবে লিখতে পারবেন না৤ কেউ কেউ চেয়েছেন, ’গল্প‘ লেখা হোক-- ”গল্‌প“ ’মগ্ন‘ লেখা হোক-- ”মগ্‌ন“ এভাবে৤ এতে সারা লেখা জুড়ে হস্ চিহ্নের ছড়াছড়ি হবে, আগেকার দিনে হাতে করে তা কম্পোজ করা জটিলতর হত, এ যুগে কম্পিউটারে তা লেখাও তেমন সহজ নয়৤ কারণ পদে পদে তো হস্৤ বাংলায় এভাবে যুক্তবর্ণ লিখতে গেলে লেখার অন্তত ৮.২২% শতাংশ হস্-এর জালে জড়িয়ে যাবে৤ লেখাটা মাকড়সার জাল হয়ে উঠবে৤ যদিও তা চালু বর্তমানের হরফ-দলার চেয়ে ভালোই হবে৤ ব্রাহ্ম লেখার চেয়ে ব্রাহ্‌ম লিখলে বুঝতে সুবিধেই হবে৤ ব্রাহ্ম লিখলে আরও সুবিধে৤ এতে হস্ চিহ্ন নেই, অথচ যুক্তবর্ণ সহজ ও স্পষ্ট ভাবে গঠিত৤ এতে শিশুদেরও প্রবেশ অবাধ, অনায়াস৤

          প্রচলিত যুক্তবর্ণ গঠনে তিনটি প্রধান ভাগ দেখা যায়-- 




দুভাবে লেখা যায়-- ক ষ= ক্ষ=ক্‍ষ

স্বচ্ছ যুক্তবর্ণে ক ষ=  ক্ষ, জ ঞ = জ্ঞ,  মাত্র এদুটিকে মণ্ড হরফ হিসেবে বজায় রাখা হবে৤ কারণ এদুটিকে স্বচ্ছ তথা বিশ্লিষ্ট করে লিখলে উচ্চারণ সংকট হবে৤ অন্য যুক্তবর্ণের ক্ষেত্রে কিন্তু স্বচ্ছ তথা সমবায় পদ্ধতিতে বিশ্লিষ্ট করে লিখলে উচ্চারণ সংকট হবেনা৤

          সকল ক্ষেত্রে একই নীতি নিয়ে স্বচ্ছ করে যুক্তবর্ণ লিখতে পারা বাংলাভাষার পক্ষে এক বিরাট লাভ হবে৤ শিশুদের বাংলা শেখায় অসুবিধা দূর হবে, এমনকী বয়স্কদেরও বাংলা নিয়ে সংকট কমে যাবে৤ হাতে করে লেখা অবশ্য এই মুহূর্তে পালটে ফেলা যাবে না, তাতে অভ্যাসের সংকট হতে পারে৤ তাই হাতে করে লেখা যেমন চলছে চলুক, ছাপার ক্ষেত্রে যুক্তবর্ণ স্বচ্ছ করেই লিখতে হবে৤ 

                  







  ডিসেম্বর-২০১২ 
 বাভাস
বাংলা লেখা কেমন হবে
মনোজকুমার দ. গিরিশ 

পর্ব-

          বাংলা ভাষায় যাঁরা লেখালিখি করেন তাঁরা  নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন যে, বাংলা বানানে প্রবল রকম সংস্কৃতের উপস্থিতি৤ একটা শব্দ লিখতে গেলে তার সঠিক বানান লেখা প্রায়ই দুষ্কর হয়ে ওঠে৤ লেখা চলবে ’দেশি‘, কিন্তু লিখতে হবে ’দেশীয়‘৤ এটা হবে আধুনিক সংস্কার অনুসারে৤ আগে তো গভর্নর লেখা হত ’গভর্ণর‘৤ গভর্নর শব্দটি ইংরেজি শব্দ তার বানানও সংস্কৃতের বানানের নিয়মে নিয়ন্ত্রিত হত৤ পরে সেখানে ছাড় দেওয়া হল৤ হয়তো সাহসে আর কুলোত না৤ 

ধবধবে ফর্সা লোক, আর হাউমাউ করে ইংরেজি বলাকে ভয় লাগত৤ সবাই তো আর বিদ্যাসাগরের মতো ইংরেজদের মুখের সামনে চটি নাচাতে পারে না! তাই ছাড়৤ তবে কালোকুলো দেশীয়দের ভাষায়ও যে ছাড় দেওয়া হল, তা নয়৤ সেখানে দাপট রইল যথাপূর্ব৤ তাই ইংরেজি সহ সকল বিদেশি শব্দের বানান উচ্চারণ অনুযায়ী করার অনুমতি দেওয়া হল৤ সুতরাং ইংরেজি শব্দটির ’গভর্নর‘ বানান লেখা সম্ভব হল৤ কিন্তু যেসকল শব্দ সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসেছে তাদের ক্ষেত্রে নো ছাড়৤ ঘাড় গুঁজে তাদের বানান সেই সংস্কৃত করেই লিখতে হল৤ 


          এর ফল হল এই যে, কোন্ শব্দ সংস্কৃত তা জানার দরকার হল৤ অনেক শব্দ দেখতে যেন সংস্কৃত কিন্তু আসলে তা নয়৤ ফলে এতে কিন্তু জটিলতা বাড়ল৤ আর সংস্কৃত বানানের নিয়মসমূহ জানা দরকার হয়ে পড়ল, নয়তো পদে পদে হোঁচট খেতে হবে৤ আর হয়ও যে তা-ই সে কথা সবাই-ই জানেন৤ লেখার চেয়ে তার অঙ্গরাগই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়৤ মন সে দিকে চলে গেলে লেখার মান কমে, ঠিক যা যা ভাবা হয়েছে তা আর ঠিক তেমনভাবে লেখা হয়ে ওঠেই না৤ সে দুঃখ আর কাকে বলার! 

       লিখব বিজ্ঞানের কথা আর ভাবতে হবে বানান কী হবে তা নিয়ে৤ বড় কঠিন অবস্থা৤ পণ্ডিত শিক্ষিত গুণী ব্যক্তিরও রেহাই নেই, পটাপট ভুল হয়৤ আর আমার? সে দুঃখের কথা আর না বলাই ভালো৤ 

একটা জরুরি কথা এখানে বলা দরকার৤ বাংলা বানানের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হল, তৎসম শব্দের বিশেষ নিয়ম, আর বাকি সব শব্দের অন্য নিয়ম!  অরুণ সেনের অভিযোগ মারাত্মক-- ’যে-শব্দকে কোনো অভিধানে তৎসম বলা হয়েছে, সেই শব্দকেই হয়তো অন্য অভিধানে তদ্ভব বা এমনকী কখনো বিদেশী বলে গণ্য করা হয়েছে৤‘(বানানের নিয়ম- পৃঃ৫২)৤ 

অরুণ সেন আরও বলেছেন--”বাংলা ভাষায় লেখালেখি, পড়া ও পড়ানো, বই বা পত্রপত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশনা কিংবা প্রুফ-দেখার কাজ ইত্যাদিতে যাঁদের জীবনের একটা বড় সময় কেটেছে, তাঁদের বহু মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি অন্তত এই :বাংলা বানান নিয়ে যথেচ্ছাচার কত রকমের এবং কত গভীর হতে পারে তা চাক্ষুষ করা৤ ... পৃথিবীর সব ভাষাতেই মৌলিক এবং আগন্তুক ভাষার মিশ্রণ ঘটেছে৤ কিন্তু বাংলাভাষার ইতিহাসে যেভাবে ঘটেছে তা অন্যত্র বোধহয় তুলনীয় নয়৤ তাই এখানে বানানের যে জটিলতা তা এই ইতিহাসের কারণেই এবং তা এই ভাষারই নিজস্ব৤ এর সমাধানও হবে এই নিজস্বতাকে মেনে নিয়ে৤...সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের বানানে যে রক্ষণশীলতা তা কিন্তু চিরকালের৤ সেই ভাষার বহু চিহ্নই অনেকাংশে তাদের অর্থ হারিয়ে ফেলেছে ঠিকই, সংস্কৃতচর্চাও প্রায় বিলুপ্তির পথে, তবু তৎসম শব্দের চেহারা এমন গেঁথে আছে লোকস্মৃতিতে যে তাকে ’বৈজ্ঞানিক‘ বুদ্ধিতে লোপ করার চেষ্টা করলে বাঙালির মনোজগতের শৃঙ্খলাকেই ব্যাহত করা হবে৤ বাংলা ভাষার তৎসম শব্দের এই ’অবৈজ্ঞানিক‘ বানানই এখন বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ৤“ (বানানের নিয়ম, পৃঃ ১৭, ১৯)৤ 


”বাঙালির মনোজগতের শৃঙ্খলাকেই ব্যাহত করা হবে“ বললেও  বাংলা বানানে যদি সত্যিই সরলতা স্পষ্টতা আনতে হয় তবে বাংলা বানানকে উচ্চারণ ভিত্তিক করতে হবে৤ নয়তো আমরা লিখব একরকম আর পড়ব অন্যরকম এটা একটা হাস্যকর ব্যাপার৤ 

যদি লিখি-- ”মার্জারে (বিড়ালে) মৎস্য আহার করে, অলাবু(লাউ) ভক্ষণ করে না৤“ কেউ যদি পড়ার সময়ে সেটাই পড়ে ”মেকুরে মাছ খায়, কদু সাঁটায় না৤“ তবে সেটা কেমন হবে?!  লেখা থাকবে একরকম, আর সেটা আমরা পড়ব অন্য অনুবাদে, কিংবা বলাটা অনুবাদ করে লেখা হবে? এসব দিক-হারা ব্যবস্থার কোনও দরকার আছে কি? 

 আমরা সরাসরি লিখব৤ যা বলা হবে, লেখাও হবে হুবহু তাই-ই৤ অকারণ ব্যত্যয় ঘটিয়ে ’পথ হারানো পথিক‘ হবার কোনও দরকার আছে কি? এক কালে লেখা ’পথ হারায়নি‘, পরে তা মুখের বলার সঙ্গে তাল রাখতে না পেরে পথ হারিয়ে ফেলেছে, যেটুকু হারিয়েছে, তা এবার আমাদের আপন উদ্যোগে ধরিয়ে দিতে হবে, আর সেটা যে আমাদেরই একান্ত আপন স্বার্থে৤

                  



 








কোন মন্তব্য নেই: