শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১০

বাংলা মুদ্রণ ও হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণ ‎




ঠিক ঠিকভাবে পড়তে হলে নীচের ফন্টেই লেখাটি পড়া দরকার৤

অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য
বিনামূল্যে সর্বান্তিক বাংলা ইউনিকোড ফন্টটি সরাসরি ডাউনলোড করুন নীচের এই লিংকে ক্লিক করে৤‎


অহনলিপি-বাংলা১৪ (AhanLipi-Bangla14) ফন্ট৤  Windows7 environment




সঙ্গে দেওয়া ফাইল দেখে নিতে হবে৤

অহনলিপি-বাংলা১৪ ডিফল্ট টেক্সট ফন্ট সেটিং
(AhanLipi-Bangla14 Default text font setting)
Default text font setting ডিফল্ট টেক্সট ফন্ট সেটিং

এবং




অহনলিপি-বাংলা১৪ ডিফল্ট ইন্টারনেট সেটিং
(AhanLipi-Bangla14 Default Internet setting)

(Default font setting ডিফল্ট ফন্ট সেটিং)

on internet(Mozilla Firefox)
(top left) Tools  
              Options--contents
              Fonts and Colors
              Default font:=AhanLipi-Bangla14
                        Advanced...
                                    Fonts for: =Bengali
                                    Proportional = Sans Serif,   Size=20
                                    Serif=AhanLipi-Bangla14
                                    Sans Serif=AhanLipi-Bangla14
                                    Monospace=AhanLipi-Bangla14,  Size=20
                                    -- OK
            Languages
            Choose your preferred Language for displaying pages
            Choose
            Languages in order of preference
            Bengali[bn]
            -- OK
 -- OK

          এবারে ইন্টারনেট খুললে ‘অহনলিপি-বাংলা১৪’ ফন্টে সকলকিছু দেখা যাবে৤ নেটে এই ফন্টে সব কিছু লেখাও যাবে৤







 বাংলা নতুন-বানান’ রীতি প্রয়োগ করে লিখবার জন্য AALOY-Font Group.zip থেকে অতিরিক্ত কিছু ইউনিকোড ফন্ট ডাউনলোড করুন  
অহনলিপি-বাংলা(AhanLipi-Bangla) কিবোর্ড ব্যবহার করতে হবে৤ 
https://sites.google.com/site/ahanlipi/home/bangla-natun-banan-font/AALOY-FontGroup2014.zip






বাংলা মুদ্রণ ও

হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণ

মনোজকুমার দ. গিরিশ ‎

ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড (Nathaniel Brassey Halhed ১৭৫১-১৮৩০, ‎জীবনকাল ৭৯ বছর) একজন ইংরেজ সাহেব৤ তিনি ভারতের রাজধানী ‎কোলকাতায় বসে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজিতে একখানি বাংলা ব্যাকরণ লিখলেন৤ ‎কোলকাতা তখন ভারতের রাজধানী, ৫ বছর আগে ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ‎কোলকাতা ভারতের রাজধানী হয়েছে৤ কোলকাতা ভারতের রাজধানী ছিল ১৩৯ ‎বছর, ১৭৭৩ থেকে ১২ ডিসেম্বর ১৯১১ অবধি৤
পলাশীর যুদ্ধের ১৬ বছর পরে কোলকাতা ভারতের রাজধানী হয়৤
বইটির নাম ‘আ গ্রামার অব দ্য ‎বেংগল ল্যাংগুয়েজ’(A Grammar of the Bengal Language), তখন বয়স তাঁর ‎২৭ বছর৤ সেখানে বাংলা হরফে প্রচুর উদাহরণ দেখানো হল৤ কারণ বাংলা ‎শিখতে হলে বাংলা হরফে লেখা চেনা, জানা, বোঝা দরকার৤ বাঙালিরা তো ‎বাংলা হরফ চেনেই, বইখানি ইংরেজদের জন্য লেখা৤ তারা বাংলা শিখে এদেশ ‎যাতে ঠিক মতো শাসন করতে পারে৤ প্রজার সঙ্গে রাজার বা রাজার ‎কর্মচারীদের যদি সরাসরি যোগাযোগ না ঘটে তবে শাসনে বিঘ্ন ঘটে৤ তাই এই ‎বইটি মূলত এখানে কর্মরত ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা শেখাবার জন্য লেখা ও ‎ছাপা হয়েছিল৤ ‎
ইংরেজরা কতখানি উদ্যোগী এবং পরিশ্রমী তার একটি বড় প্রমাণ এই ‎বইখানি৤ নয়তো কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে এই দেশে এসে তারা দেশ ‎দখল আর শাসন করতে পারত না৤ ‎
বইখানি ছাপা হয় ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গের হুগলিতে৤‎
 
বইখানি যে ফিরিঙ্গিদের উপকারার্থে সে কথা বইখানিতে বলাই আছে৤


-----------------------

---                   হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণ ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হুগলিতে ছাপা বই৤

কী করে বইখানি ছাপা হল? কেন ছাপাছানায় দিলেই তো তারা ছেপে ‎দেবে৤ আজকালকার দিনে বসে এ কথা মনে হতে পারে যে বই ছাপা হওয়া আর ‎কী কঠিন কাজ? ছাপাখানায় দিলেই হল, ছাপতে অসুবিধে কী? ‎
সাল তারিখটা বিশেষ করে মনে রাখতে হবে৤ সময়টা হল পলাশির ‎যুদ্ধের ২১ বছর পরে৤ আর দেশে তখন বাংলা ছাপাখানাই ছিল না৤ হুগলির ‎এন্ড্রুজ সাহেবের যে-ছাপা খানায় বইখানি ছাপা হয়, সেখানে ছাপাখানায় ‎ইংরেজিতে ছাপার কাজ হত৤ বাংলা ছাপার হরফই তৈরি হয়নি তখন৤ হয়নি ‎তো হয়নি, তা বলে উদ্যমী উদ্যোগী ইংরেজরা চুপ করে বসে থাকার পাত্র নয়৤ ‎তারা লেগে পড়ল কী করে বাংলা ছাপার হরফ বানানো যায় তার ব্যবস্থা করতে৤ ‎দেশীয় লৌহ কারিগর পঞ্চানন কর্মকারকে ধরলেন চার্লস উইলকিনস্(Charles ‎Wilkins ১৭৪৯-১৮৩৬, জীবনকাল ৮৭ বছর) নামে একজন সাহেব তাঁর বয়স তখন ‎২৯ বছর, তাঁদের জন্য বাংলা হরফ লোহার উপরে ছেনি দিয়ে কেটে বানিয়ে ‎দেবার জন্য৤ ‎
অনুমান করা যায় পঞ্চাননের বয়সও তখন কম ছিল৤ [উইলকিন্‌স বন্ধু হালহেদের বইটি ছাপার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হলেন৤ ... অবশেষে চুচুঁড়ায় একটি ছোট্ট কামারশালায় তিনি সন্ধান পেলেন এক যুবকের৤ স্বাস্থ্যবান, কৃষ্ণকায় এই যুবকটিকে তাঁর খুব পছন্দ হল৤ নাম তার পঞ্চানন কর্মকার৤--মহামন ধর্মপাল, পৃঃ২০৯, বর্ণপরিচয়, নভেঃ-ডিসেঃ ২০০৯]৤ ছাপাখানাও হুগলিতে, আর পঞ্চাননও হুগলির লোক৤ কাছাকাছি লোক পাওয়াতে সুবিধেই হল৤


 এক ইংরেজের বয়স ‎২৭, অন্য ইংরেজের ২৯ আর তরুণ পঞ্চাননের বয়স সম্ভবত ২২/২৩ হবে৤ এই ‎অনুমানের কারণ তরুণ ইংরজরা তরুণতর কাউকে ধরতে সাহস পেল তাদের এই “উদ্ভট” ‎ কাজ করে দেবার জন্য, নয়তো অধিক বয়স্করা যে তাদের এই “উদ্ভট” কাজের কথায় আমলই দেবে না, ‎আর তাছাড়া, বয়স্করা তেমন উদ্যোগীও হবে না৤ লোহা কেটে হরফ বানাবার ‎মতো “পাগলামি” বয়স্ক লৌহ কারিগরেরা ফুঁ দিয়েই উড়িয়ে দেবে সে ভয় তো ‎তাদের ছিলই, আবার সে হরফ হবে কিনা বাংলা হরফ, যার কোনও নজিরই ‎নেই৤ এই অতি অবাণিজ্যিক অপেশাদারী কাজে “বোকা” তরুণরাই তো রাজি ‎হতে পারে৤ হুজ্জুতে সাহেবদের এসব ‘বোকা বোকা’ কাজে কেজো লোকেরা ‎রাজি হবে এমন আশা ছিল না, তাই অনেক খুঁজে পঞ্চাননকে বের করতে ‎হয়েছে৤ পঞ্চানন রাজি হল৤ তরুণদল নেমে পড়ল নতুন এক অভিযানে৤ ‎

ছেনি দিয়ে লোহা কেটে হরফ বানাবার জন্য তারা পঞ্চাননকে শেখালেন ‎কেমন করে হরফ তথা টাইপ বানাতে হয়৤ এ কাজটি চার্লস উইলকিনস্ কিছুটা ‎জানতেন৤ পঞ্চানন খুবই দক্ষ কারিগর, তিনি একটু একটু করে ধরে ধরে এক ‎একটি বাংলা হরফ ছেনি দিয়ে লোহা কেটে তৈরি করতে থাকলেন৤ আগে ‎কোনও কোনও জায়গাতে বাংলা হরফে কিছু ছাপা হয়েছিল ব্লক করে, বাংলা ‎হরফ কেমন তার উদাহরণ দেখাবার জন্য৤ সেসব বিদেশের ব্যাপার৤ আলগা ‎হরফ অর্থাৎ আলাদা আলাদা হরফ বাংলায় এর আগে কখনও তৈরিই হয়নি, যাকে ‎বলে বিচল হরফ (moveable type)৤ সামনে কোনও উদাহরণ নেই, তবু ‎পঞ্চানন কর্মকার অতি দক্ষতায় এক একটি করে বাংলা হরফটাইপ তৈরি করতে ‎লাগলেন৤ আর তা যে কতখানি সার্থক প্রায়স তা এই হরফ দিয়ে ছাপা পৃষ্ঠা ‎দেখলে বোঝা যাবে৤ ‎



১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ছাপা, অর্থাৎ এখন(২০১০খ্রিঃ) থেকে ২৩২বছর আগে ছাপা৤


একটা দুটো হরফ হলে তো আর বই ছাপা যায় না৤ চাই পুরো বর্ণমালার ‎টাইপ, চাই সকল যুক্তবর্ণের টাইপ এবং চাই বিভিন্ন চিহ্ন৤ কাজটি যে কত ‎কঠিন এবং ধৈর্য সাপেক্ষ, সময় সাপেক্ষ তা অনুমান করা যায়৤ সে কাজটি এই ‎ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড, চার্লস উইলকিনস্, পঞ্চানন কর্মকারের মিলিত ‎যৌথ দলকে করতে হয়েছে৤ এব্যাপারে যে ব্যয় তা সরকারি অনুদান হিসেবে ‎হ্যালহেড এবং উইলকিনস্ সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন৤ ‎
এঁরা তিনজনে মিলে একটা বিপ্লব ঘটিয়ে ফেললেন৤ বাংলাভাষা শুধু নয়, ‎বাঙালি জাতির অগ্রগতিতে এই কাজ বিপুল প্রেরণা(impetus) যুগিয়েছিল৤ ‎বাঙালির জাগরণের এটি একটি মূল প্রেরণা/নোদনা৤ ‎
বইখানি তৎকালীন বাংলাভাষার অবস্থাও পাতায় পাতায় ধরে রেখেছে৤ ‎




কিন্তু যে-কাজটি সেখানে একটি মস্ত লক্ষ্যণীয় তা হল এর বর্ণ সংযোজন৤ ‎বিশেষকরে যুক্তবর্ণ সংযোজন৤

হাতের লেখাকে অনুসরণ করে যদিও এই টাইপ তৈরি করা হয়েছে, তবু প্রতিটি ‎পদক্ষেপে যুক্তি ও শৃঙ্খলা স্পষ্ট৤ ইংরেজ জাতির চরিত্র বৈশিষ্ট্য এখানে ‎রক্ষিত হয়েছে৤ তাঁরা বিদেশি বলে বাংলা হরফ-সংগঠন নিয়ে কোনও প্রাক-‎সংস্কার তথা prejudice তাঁদের ছিল না, ফলে তাঁরা বেশ সহজ যুক্তিশীল পথে ‎অগ্রসর হয়েছেন৤ যদিও চালু ব্যবস্থার সবটা তাঁরা ভাঙেননি বা ভাঙতে ‎পারেননি, ভাঙতে চাননি৤ সবটা ভাঙলে তা আর তো বাংলা থাকবে না, আর ‎বিদেশিরা তা পড়ে ভুল বাংলা শিখবে৤ তাই যতটা গেলে তা সহনসীমার মধ্যে ‎থাকে তেমনভাবেই তা করা হয়েছে৤ বিশেষ করে যুক্তবর্ণ গঠনে তারা খুবই ‎যুক্তি(লজিক logic) মেনে চলেছেন৤ কিন্তু আমরা বিশেদিদের সেই ‎তথাকথিত “অযোগ্যতা, অদক্ষতা” মেনে নেইনি৤ আমরা আবার পরবর্তী কালের ‎ছাপায় বাংলা যুক্তবর্ণকে “যথাযথ”ভাবে দলা পাকিয়েছি, খুব করে দলা পাকিয়েছি৤ ‎এতে বিদেশিরা তা শিখতে পারুক, বা না পারুক সেটা আমাদের দেখার কথা নয়৤ ‎আমরা আমাদের বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে চেয়েছি৤ ‎
‎ আমরা এখন ‎ ‎ লিখি যথাযথ পেঁচিয়ে যদিও পুরানো সেই দিনে তা সরল করা ‎হয়েছিল, কিন্তু আমরা পরে ফিরে গেছি জটিল ব্যবস্থায়৤ সেই সহজ সরল ‎ভালোটা নেবার মন বা সাহস আমাদের ছিল না৤ তাঁরা সেযুগে এটাকে করে ‎ছিলেন ‎ ‎ আমরা এটাকে এযুগে করেছি ‎ ৤‎
কেবল পিছনপানে এভাবে হাঁটার দিন, এখন আবার আমরা নতুন উদ্যমে পিছনে ‎ফেলে যেতে চাই৤ ‎ ‎ লেখার রীতিটাই সঠিক রীতি, এটাকে হাতে করে পেঁচিয়ে ‎ ‎→ ‎ ‎ লেখার চেষ্টায় লাভ নেই, কিন্তু লোকসান আছে অনেকই৤ ‎
এখানে কিন্তু ষ-এর তলায় ল লেখা হয়নি, আগেকার দিনে ণ লেখা হত ‎ ‎ ৤ তাই ষ-এর তলায় ‎ ‎ বসিয়ে লেখা হয়েছে ‎ যদিও এভাবে লেখাটা ‎আমাদের কাছে কুযুক্তি বলে মনে হয়েছে৤ তাই ওসব ‘ছেলেমানুষী’ বাদ দিয়ে ‎অনায়াসে আমরা লিখেছি ‎ ৤ ‎

কেন এভাবে লেখা হল? লেখা দেখে তো মনে হয় যেন তা, ষ+ঞ৤ কিন্তু তা ‎যে নয়, তা তো আমরা দেখলাম৤ এর একটা আনুমানিক বিবর্তন আমরা কল্পনা ‎করে দেখি(অবশ্যই সেভাবে এই বিবর্তন হয়নি, কিন্তু ভাবতে ভালো লাগল)--‎ ‎ এটাই হাতে করে লেখা হত ‎‎, প্রাচীন ‎পাণ্ডুলিপিতে তেমনই দেখা যায়৤ ‎
এযুগে আমাদের অনভ্যস্ত চোখে তখনকার প্রয়াস হয়তো কৌতুককর মনে ‎হবে, কিন্তু সেটাই যে সঠিক সে উপলব্ধি এখন অন্তত আমাদের হওয়া ‎উচিত৤ কাল তো কত কেটে গেল, শৈশব কাটবে কবে? ‎
একটু উদাহরণ দেখা যাক--‎
























লাইনো টাইপে(১৯৩৫) আমরা এই রীতি ফিরে পেয়েছিলাম, সেটা ‎কোলকাতার আনন্দবাজারে শুরু হল৤ কিন্তু তা আবার হারিয়ে গেল ফটোটাইপ ‎সেটিং (পিটিএস) শুরু হতেই৤ কম্পিউটার কম্পোজিং (১৯৭৯/৮০) আমাদের ‎আবার যুক্তবর্ণ লেখার ব্যবস্থা, বা লজিককে পিছিয়ে দিল৤ আনন্দবাজার জানাচ্ছে ‎তাঁদের বাংলা ফন্ট তৈরির কাজে সাহা‌‌‍য্য করেছেন মিস ফিয়োনা রস৤ এই ‎ইংরেজ ভদ্রমহিলা নাকি বাংলা লাইনো টাইপ নিয়ে কাজ করছিলেন৤ আসলে ‎পিটিএস তথা কম্পিউটার কম্পোজিং আমাদের পিছিয়ে দিল, নাকি আমরা বিশেষ ‎কারণে পিছিয়ে গেলাম, পিছিয়ে যেতে চাইলাম? মূল কারণটা হল পেঁচিয়ে দলা ‎পাকিয়ে লিখলে জায়গা কিছুটা কম লাগে তাতে খরচা কম, আয় বেশি, মুনাফা ‎বেশি৤ ক্ষতি হল বাংলাভাষার এবং বাঙালি জাতির৤ সেই বোধটা এখন অন্তত ‎ফিরে আসুক৤ ‎
এমনি করে পেঁচিয়েই যে লিখতে হবে এমন নয়, আরও একটু যুক্তিশীল ‎হতে বাধা নেই৤ যেটা লাইনো টাইপে বেশ অনেকটা এসেছিল৤ ‎
বাংলায় যুক্তবর্ণ হয় তিন রকম৤ (১)দুই বর্ণ (২)তিন বর্ণ (৩)চার বর্ণ৤ দুই ‎বর্ণের কমে তো আর যুক্তবর্ণ হতে পারে না, তেমনি চার বর্ণের বেশি বর্ণ মিলে ‎বাংলায় যুক্তবর্ণ হয় না৤ অন্য ভাষায় হতে পারে৤ ‎
দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান করে আমি যুক্তবর্ণের যে তালিকা তৈরি করতে ‎পেরেছি তাতে (১)দুই বর্ণ মিলিয়ে যুক্তবর্ণ পয়েছি ২১১টি, (২)তিন বর্ণ মিলিয়ে ‎যুক্তবর্ণ পয়েছি ১৬৮টি, আর (৩)চার বর্ণ মিলিয়ে যুক্তবর্ণ পয়েছি ১৬টি৤ দুই বর্ণ ‎‎=২১১, তিনবর্ণ=১৬৮, চার বর্ণ=১৬৤ সর্বমোট=(২১১+১৬৮+১৬=)৩৯৫৤ বাংলায় ‎মোট যুক্তবর্ণ আছে অন্তত, তিনশত পঁচানব্বই৤ ‎
এই হিসেবে অবশ্যই হেরফের হতে পারে৤ তা ছাড়া যুক্তবর্ণ কাকে বলব ‎তার উপরেও এটা অনেকটা নির্ভর করে৤ নির্ভর করে যুক্তবর্ণের প্রাচীন ধারণা ‎এবং যুক্তবর্ণের আধুনিক ধারণার উপরেও৤ একটি উদাহরণ দিই৤ ‘সঙ্গীত’ শব্দটি ‎এখন লেখা চলে ‘সংগীত’৤ দুই বর্ণ মিলে ‘ঙ্গ’ যুক্তবর্ণ ঠিকই, কিন্তু “ংগ” ‎সমাবেশকে কি যুক্তবর্ণ বলা হবে, যদিও সেখানে দুটি ব্যঞ্জনবর্ণ মিলিত ‎হয়েছে? যেমন ‘অহং’ লিখতে “হং” যুক্তবর্ণ হবে কি, আবার-- অহঃ, গঁদ, ‎রঁদা(Rodin), এখানে হঃ, গঁ, রঁ এগুলো যুক্তবর্ণ বলে গৃহীত হবে কি? ‎
আরও মজার ব্যাপার আছে৤ সরকার, দরকার কথাগুলি কি সর্কার, দর্কার --‎এভাবে লেখা যাবে? কোলকাতা কি ‘কোল্কাতা’ লেখা যাবে? যেমন লেখা যাচ্ছে ‎উলটো, পালটা আগে লেখা হত উল্টো,পাল্টা৤ ‎
সুতরাং আগে দৃষ্টিভঙ্গী ঠিক করতে হবে কাকে ঠিক যুক্তবর্ণ বলা হবে৤ ‎অর্থাৎ লেখালিখি ঠিক কীভাবে করা হবে তার উপরে নির্ভর করছে বাংলায় ক’টা ‎যুক্তবর্ণ আছে বা হবে৤ উৎকট, উৎপাত লিখতে যদি উত্কট, উত্পাত লিখি তবে তাতে ‎বাধা কী? খণ্ড-ত(ৎ) তো অর্ধ-ত[কল্পনা করা যাক না-- ‎ ‎ ‎এটি কি এমনি করে বিবর্তিত হয়েছে?], তাই সেখানে যুক্তবর্ণ করে ত্ক, ত্প ‎লিখতে বাধা কী? ভাষা ও বানান হল একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি, সে ‎চুক্তি মতোই তো লেখা পড়া চলবে৤ কোনও একজনের মতের উপরে চলতে ‎পারে না৤ তেমন হলে বিশৃঙ্খলা হবে৤ বাংলা বানানে যে এত গোল, তার মূল ‎কারণ সেটাই, যে-যার নিজের মতো করে আমরা চলতে চাইছি৤ ফলে পদে পদে ‎বানান ভুল৤ আসলে এটা ভুল না বলে, বিশৃঙ্খলা বলাও যায়৤ ‎
ভাষাবিজ্ঞানী ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যার সদস্য ছিলেন সেই ‎‎‘পূর্ববঙ্গ সরকারি ভাষা কমিটি’(১৯৪৯) পূর্বপাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা ও বানান নিয়ে ‎যে সুপারিশ করেছিলেন সেই অগ্রগত, উন্নত ও কাম্য প্রয়াস কার্যকর হয়নি, করা ‎যায়নি৤ করলে আজ বাংলাভাষা আরও অনেক এগিয়ে যেত৤ অবশ্য তা কার্যকর ‎না হবার পিছনে তৎকালীন বিক্ষুব্ধ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি দায়ী৤ ‎বাংলাভাষার প্রতি বাঙালির ভাবাবেগ এর পিছনে প্রবলভাবে কাজ করেছে৤ ‎
যখন বাংলায় ছাপা শুরু হয়েছিল তখনও এক বিরাট বাধা তার সামনে এসে ‎দাঁড়িয়েছিল৤ তা হল হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ছাপাখানায় ছাপা হওয়াতে তা ধর্মপ্রাণ মানুষ ‎বর্জন করেছিলেন৤ কারণ? ম্লেচ্ছদের যন্ত্রের ছোঁয়া লেগে ধর্ম কলুষিত ‎হচ্ছিল৤ সেই কঠিন বাধা উত্তরণ করা গেছে দুরন্ত কৌশলে৤ এখন শুনে ‎হাস্যকর ছেলেমানুষী মনে হবে৤ ছাপার কালির সঙ্গে পবিত্র গঙ্গা জল মিশিয়ে ‎ছাপা শুরু করাতে ধর্মীয় গোঁড়ামি কমেছিল৤ এই কৌশল না করলে বাংলা ছাপার ‎কপালে অনেক দুঃখ ছিল৤ বাংলা ভাষা ও বানানে ১৯৪৯-এর পূর্ববঙ্গীয় সংস্কারে ‎দুর্গ্রহ কিন্তু এড়ানো যায়নি৤ কবে কেমন করে যে যাবে, তা গভীরভাবে ভাবতে ‎হবে৤ সেখানেও দরকার হলে গঙ্গাজল, অথবা পীরের পরা পানি ছিটোতে ‎হবে৤ যে রোগের যে ওষুধ৤ জল-বিদ্যুৎ নিয়ে একবার গুজব রটেছিল যে, চাষের ‎জন্য যে সেচের জল নদী থেকে পাওয়া যায় তার শক্তি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ‎কালে শুষে নেওয়ায় সে-জলে কোনও কাজ হবে না[বিদ্যুতের সঙ্গে জলের ‎কোনও সম্পর্ক নেই, জলের তীব্র বেগ কেবল বিদ্যুৎ-যন্ত্রের টারবাইন ঘোরাতে ‎কাজে লাগানো হয়]৤ অশিক্ষা কুশিক্ষা নিরক্ষরতার অভিশাপ আমাদের পদে পদে ‎পিছিয়ে রাখছে৤ সে বিপদ অতিক্রম করার সেই রকম পথই নিতে হবে যা ‎দেশের মানুষ সহজে বুঝতে পারে, নিতে পারে৤ অগ্রগতির স্বার্থে তাই ভাষা ‎সংস্কার, বানান সংস্কার আটকে রাখা যাবে না৤ রাখলে, রাখতে হলে-- জাতি ‎পিছিয়ে পড়বে৤ তার ঘোষিত নীতিতে বাংলাদেশের‏ ‏বিজ্ঞান বিষয়ক ওয়েবসাইট ‎বিজ্ঞানী‏.‏ওআরজি ‎‏ ‏biggani.org যেমন জানায়--‎‏ ‏‎“প্রযুক্তি‏ ‏গ্রহণে‏ ‏দেরী‏ ‏করলে‏ ‏দেশ‏ ‏পিছিয়ে‏ ‏যাবে৤” অবোধেরা নাহয় সেটা বুঝবেন না, বোধসম্পন্ন মানুষেরা কেন ‎থমকে যাবেন? ভাষা-সংস্কার, বানান-সংস্কারকাজে কেবল অবোধেরা বাধা নন, ‎বোধসম্পন্ন মানুষেরাও মস্ত বড় বাধা৤ কেবল তা অনুমান নয়, তেমন উদাহরণ ‎শোনা গেছে, তেমন উদাহরণ দেখা গেছে৤‎

ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেডের যুগে যেসকল যুক্তবর্ণ ছিল তার অনেকগুলি আর ‎এ যুগে নেই, যেমন-- ঙ্ঙ__‎ ‎, ঙ্ত্র__‎ ‎, ঙ্ব__‎ ‎, ঙ্য=ঙ্‍য__‎ ‎, ঙ্ল__‎ ‎, ঙ্শ__‎ ‎, ‎ঙ্ষ__‎ ‎, ঙ্স__‎ ‎, ঙ্হ__‎ ‎, ট্ক্ষ__‎ ‎, ট্শ__‎ ‎, ট্ষ__‎ ‎, ট্স__‎ ‎, ট্হ__‎ ‎, ‎ব্ঝ__‎ ‎, ষ্থ__‎ ইত্যাদি৤ ‎

এগুলির ব্যবহার সেযুগে হয়তো ছিল, কিন্তু এযুগে আর এর ব্যবহার দেখা যায় ‎না৤ আবার এর কতকগুলি সে-সময়ে ভিন্ন রকম করে লেখা হত, এযুগের লেখার ‎সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া ভার, যেমন-- জ্‍ঞ=জ্ঞ__‎ ‎, ঞ্চ__‎ ‎/ ‎ ‎(দ্বিতীয় ‎রূপটি এখন চলে), ণ্ট__‎ ‎, ণ্ঠ__‎ ‎, ণ্ড__‎ ‎, ণ্ঢ__‎ ‎, ণ্ণ__, হ্ণ__‎ ৤ এসব ‎বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে মিলছে না, কারণ তখন ণ লেখা হত, ণ= ৤ ন্ধ__‎ ‎, ব্ধ__‎ ‎ (প্রায় এটির ‎মতো করেই এখনও লেখা হয়, শুধু সামনের বাহুটি আর কিছুটা নীচে নামবে),
()‎ষ্ণ__‎ ‎ ৤ ‎

এখন আমরা দুই হরফ মিলিয়ে দলা করে লিখলেও সে গ্রন্থে খুব স্পষ্ট ‎করে আলাদা হরফ উপরে নীচে লেখা হত৤ দলা পাকানো উদাহরণ কম, তবে ‎দলা পাকানো হরফও আছে, যেমন-- ঞ্চ__‎ ‎/৤ ‎
ষ্ণ__‎ ‎ এই রূপটি হাতে লেখা রূপ, ছাপার রূপ নয়৤ এই রূপটিই এখন চলে৤ ‎

সেযুগে টাইপ নির্মাতারা লজিক মেনে ছাপার টাইপ তৈরি করেছেন৤ ‎আমরা তাঁদের আমল না দিয়ে হাতের লেখার মতো করে তৈরি টাইপে দলা ‎পাকিয়েছি৤ কিন্তু এসকল মণ্ড হরফ বাংলার দুঃখ বাড়ানো ছাড়া আর কিছু কাজে লাগেনি৤ ‎শিশু শিক্ষার্থীদের মাথায় বোঝা চাপা ছাড়া এতে আর কিছু এগোয়নি৤ সেযুগের ‎তাঁরা নাহয় লজিক মানার চেয়ে হরফমণ্ড বেশি পছন্দ করতেন এযুগে আমরা ‎কতটা কী করছি? ‎

এই ভাবে স্পষ্ট করে লেখায় বাধা কী? ঙ্ক__‎ ‎,ঙ্ক্ষ__‎ ‎,ঙ্খ__‎ ‎, ‎ঙ্গ__‎ ‎,ঙ্ঘ__‎ ‎, ঞ্চ__‎ ‎,ঞ্ছ__‎ ‎,ঞ্জ__‎ ‎,ঞ্ঝ__‎ ‎, ণ্ট__‎ ‎,ণ্ঠ__‎ ‎, ‎ণ্ড__‎ ‎,ণ্ঢ__‎ ‎,ণ্ণ__‎ ‎, দ্গ__‎ ‎,দ্ঘ__‎ ‎,দ্ব__‎ ‎(বর্তমান এবং প্রাচীন দুটি রূপ ‎একই), দ্ভ__‎ ‎,ন্ত__‎ ‎,ন্থ__‎ ‎, ন্দ__‎ , ন্ধ__ ,ন্ন__ , ব্জ__ ,ব্দ__ ,ব্ধ__ ,ম্প__ ,ম্ফ__ ,ম্ব__ ,ম্ভ__ ,ম্ম__ ,শ্চ__ , শ্ছ __ ,ষ্ট __,ষ্ঠ__ , ষ্ণ__ () ,স্ক__,স্খ__,স্ত__ ‎,স্থ__‎

সেই সব লেখা দেখে আজ চেনা একটু কঠিন৤ যদিও হাতের লেখায় ‎হরফের রূপ অনেক তাড়াতাড়ি পালটে গেলেও ছাপায় পালটায় খুব ধীরে৤ ‎ইংরেজিতেও ছাপার রূপ পালটেছে, যেমন, ছাপায় হ্যালহেডের বইতে ‎ছোটহাতের s=‎ ‎ লেখা হয়েছে৤ দেখে এটিকে যেন মনে হয় f , যেখানে ছাপা যত আগে চালু ‎হয়েছে সেখানে হরফের রূপ প্রায় সেই একই যায়গায় স্থির হয়ে আছে৤ এতে ‎লাভ এই যে প্রাচীন কালের বইপত্র পড়া কঠিন নয়, কিন্তু প্রাচীন হাতে লেখা ‎বই বা পাণ্ডুলিপি পড়া খুব কঠিন৤ বিশেজ্ঞরাই কেবল তা পড়তে পারেন৤ অতি ‎প্রাচীন মিশরের লিপির পাঠ উদ্ধার করা গেলেও এখন অবধি সিন্ধু সভ্যতার ‎লিপি পাঠ করা যায়নি৤ তার অবশ্য একটি বড় কারণ হল যে, সিন্ধু সভ্যতার ‎কোনও দ্বিভাষিক ফলকলিপি পাওয়া যায়নি৤ যেটা মিশরে পাওয়া গেছে৤ তাই ‎মিশরের লিপির পাঠ উদ্ধার করা গেলেও সিন্ধুলিপি এখনও সেই অচেনার ‎অন্ধকারেই রয়ে গেছে৤ সিন্ধু সভ্যতায় কোনও দ্বিভাষিক ফলকলিপি যে পাওয়া ‎যায়নি তার সম্ভাব্য কারণ হল, অন্য ভাষার মানুষদের প্রভাব এখানে পড়েনি বা ‎সিন্ধু সভ্যতার লোকেরা কখনও বিজিত হয়নি৤ তাই দ্বিভাষিক ফলকলিপি ‎তৈরি হয়নি৤ সিন্ধু সভ্যতা বিলুপ্তির কারণ হতে পারে সিন্ধুনদের প্রলয়ংকর ‎বন্যা যা এর তীর বরাবর সকল সভ্যতা মুছে দিয়েছে৤ এসকল সভ্যতা পলিমাটির ‎তলায় পাওয়া গেছে৤ সম্প্রতি যেমন পাকিস্তানে সিন্ধুনদের প্রলয়ংকর বন্যায় ‎১৫০০ শত লোক মারা গেছে৤ সেকালে হয়তো বন্যা আরও প্রলয়ংকর হয়েছিল, অথবা সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরালো ছিল না৤ ‎
আমরা এযুগে নিজেদের দিকে তাকাব, বাইরের দিকেও তাকাব৤ লিপির ‎গঠন এবং তার সংযুক্তরূপ যথাসম্ভব সরল করে লিখব৤ ইংরেজিতে যেমন ‎সরল করে লেখা হয়৤ সেখানে যুক্তধ্বনি আছে, যা যুক্তবর্ণের প্রমাণ, তবে তা ‎একটি লিপির ঘাড়ে আর একটি বসিয়ে নয়৤ অতি প্রাচীন দিনে অবিকশিত ‎সভ্যতায় মানুষ হরফের উপরে হরফ না-চাপালে তাদের যুগ্ম ধ্বনি-সংকেত ‎অনুভব করতে পারত না৤ তাই যুক্তধ্বনি বোঝানোর জন্য হরফের উপর হরফ ‎চাপিয়ে যুক্ত হরফ বা যুক্তবর্ণ তৈরি করা হত৤ প্রাচীন ভারত, মিশর ইত্যাদি ‎সকল দেশেই তা দেখা যায়৤ প্রাচীন‏ ‏ভারতে ‎=ত্র৤
প্রচীন মিশরে ‎ ‎=K L= ‎ ‎=ক্ল, ‎‏ ‏ইত্যাদি‏ ‏সকল‏ ‏দেশেই‏ ‏তা‏ ‏দেখা‏ ‏যায়৤
পরবর্তীকালে ‎মানুষের মেধা যখন বিমূর্ত চেতনাকে ধারণ করতে শিখল, তখন হরফ পাশাপাশি ‎বসিয়ে মানুষ যুক্তবর্ণ তৈরি করতে আরম্ভ করে, এবং এই ধরনের যুক্তবর্ণ ‎থেকেই তারা যুক্তধ্বনি অনুভব করতে শেখে৤ যুক্তধ্বনি বোঝাবার জন্য প্রাচীন ‎দিনের সেই হরফের উপরে হরফ চাপানোর অপ্রত্যক্ষ স্মৃতি ইংরেজিতে এখনও ‎খানিকটা রয়ে গেছে৤ যেমন-- Æ æ Œ œ &  ইত্যাদি৤ কিন্তু বাংলায় রয়ে গেছে ‎প্রায় সবটাই৤ অর্থাৎ এ ব্যাপারে আমরা প্রায় প্রাগৈতিহাসিক(!) স্তরে রয়ে ‎গেছি৤ আমাদের চেতনা কবে আসবে?‎
ব্রাহ্মীলিপি থেকে ভারতের বেশিরভাগ লিপি এসেছে, আর লিপিগুলি তার ‎উত্তরাধিকার রক্ষা করেছে লিপির উপরে লিপি চাপিয়ে লেখার রেওয়াজ বজায় ‎রেখে৤ কিন্তু আর আমরা আমাদের শিশুদের উপরে অকারণ বোঝা চাপাব না, ‎নিজেদের উপরেও অকারণ বোঝা চাপাব না, দেখা যায় অনেক যুক্তবর্ণ বড়রাও ‎সব সময়ে ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারেন না৤ সময়ের এই অপচয় রোধ করলে ‎জাতির বিকাশে তা সহায়তা করবে৤ লিখতে গিয়ে যদি হাতড়াতে হয় যে র-এ ‎হ্রস্ব-উকার/দীর্ঘ-ঊকার দিলে তার হাতলটা নীচের দিকে হবে, নাকি উপরের ‎দিকে হবে(‎ ‎)? এটি অবশ্য যুক্তবর্ণও নয়, সাধারণ বর্ণে উ/ঊ-কার যোগ ‎করা হয়েছে মাত্র৤ এই অপচয়ের কোনও ব্যাখ্যা নেই৤ কেন যে আমরা অকারণে ‎নিজেদের দ্বিধায় রাখতে চাই তা বোঝা ভার৤ ‎
আর বিদেশিরা, তাঁরা যে বাংলা আদৌ শিখেছেন এবং শিখছেন এবড় ‎আশ্চর্য কাণ্ড! কী করে ফাদার দ্যতিয়েনের মতো গুণীজন বাংলায় এত সাবলীল ‎দক্ষতা অর্জন করলেন তা ভেবে অবাক হতে হয়৤ বাংলা লিখন ব্যবস্থার এই ‎অরাজক অবস্থায়ও তাঁরা যে পিছপা হননি তার কারণ তাঁরা উদ্যমী বিদেশি, ‎বিদেশিরাই তো বাংলা ছাপার ব্যবস্থা আমাদের মতো অনুদ্যোগী বাঙালিদের ‎হাতে পৌঁছে দিয়েছেন, নইলে যে কতকাল কেটে যেত কে জানে? বিদেশিদের ‎সহায়তায় পেয়েছি লাইনো টাইপ, এবং বিদেশিরাই দিয়েছেন বাংলা ডিটিপি, ‎যেটা বাংলার সবচেয়ে শোভন হরফ সেই আনন্দবাজারী টাইপ৤ অবশ্য এটা ‎মানতে হবে যে আনন্দবাজারের আগেই “আজকাল” প্রথম অফসেটে ছাপা শুরু ‎করে তার প্রকাশনার শুরু থেকেই, যা ছিল পিটিএস যা কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত৤ ‎সে টাইপ দেবব্রত ঘোষ নামে একজন তরুণ বঙ্গভাষীর করা(ফোনে জানিয়েছেন, ‎একরাম আলি, ১৫/০৯/২০১০)৤ আসলে মূলত বিদেশি সহায়তার উপরে আমাদের ‎এসব ব্যাপারে নির্ভর করে থাকতে হয়৤ আমাদের ক্ষমতা বা উদ্যোগ সত্যিই ‎তেমন উল্লেখযোগ্য কিন্তু নয়৤ ‎
হরফে ধাক্কাধাক্কি বা মণ্ডীকরণ বন্ধ করে তা পাশাপাশি বাসানোর ‎উদ্যোগ নেওয়া দরকার৤ ইংরেজির মতো না পারলেও ‘বাংলা’র মতো করতে ‎দোষ কী? সেই প্রস্তাবই দিতে চাই৤ ‎
ইংরেজিতে যেমন class, cloud, slide, slope লিখলে cl=ক্ল, sl=স্ল এই ‎যুক্তধ্বনি বা যুক্তবর্ণ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তা হচ্ছে হরফ কেবলমাত্র পাশাপাশি ‎বসিয়ে, তেমনি বাংলায়ও বর্ণ কেবলমাত্র পাশাপাশি বসিয়ে যুক্তধ্বনি বা যুক্তবর্ণ ‎তৈরি করা যাক৤ cl=ক্ল, sl=স্ল এসকল যুক্তবর্ণে আমরা ধরে নিতে পারি যে ‎যুগ্মবর্ণের প্রথম হরফটি ছোট আকৃতির, আর দ্বিতীয় হরফটি স্বাভাবিক আকৃতির৤ ‎বাংলায় যদি আমরা লিখি-- ক্লাস, ক্লাউড, স্লাইড,স্লোপ তবে অনেকটা ‎ইংরেজির মতোই হরফ পাশাপাশি বসিয়ে লেখা হয়৤ এতে লিখতে, পড়তে, ‎বুঝতে অনেক বেশি সুবিধা হয়৤ হয়তো একদিন বাংলায়ও হরফ কেবলমাত্র ‎পাশাপাশি বসিয়ে যুক্তধ্বনি বা যুক্তবর্ণ লেখা যাবে৤ সে দিন কিছুটা দূরে হতে পারে ‎কিন্তু অলীক নয়৤ ইংরেজ পাদ্রি জন মারডকের মতো আশা প্রকাশ করা যেতে ‎পারে, "Though the proposal may now be treated with ridicule(পরিহাস), its ‎adoption is a mere question of time." এখনও যে তেমন হচ্ছেনা তা নয়, তেমন ‎শুরু হয়েছে, যথা-- উলটো কথা, পালটা মার, পাদরি, সরদারজি, সবজি, বাকস ‎ইত্যাদি৤ এক সময়ে লাইনো টাইপ চালু হবার বহুদিন পরে, লাইনোটাইপের ‎শেষের দিকে আনন্দবাজার লিখত পারক=পার্ক এবং এমনি দলাভাঙা যুক্তবর্ণ৤ ‎ভালই চলছিল লেখা৤ পরে নিন্দিত হয়ে ফিরে গেল একেবারে পুরানো সেই ‎বিদ্যাসাগরী সাঁটে৤ প্রথমে কিছু নিন্দা তো হবেই তা বলে এক লাফে গর্তে? ‎
আমরা যদি সকল বাংলা যুক্তবর্ণই স্বচ্ছ-যুক্তবর্ণ রীতিতে লিখি তবে বাংলা ‎লেখাপড়া অনেক সহজ হয়ে যাবে৤ আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা ‎বলি৤ একবার আমি পুরি বেড়াতে গিয়ে প্রায় মাসখানেক সেখানে ছিলাম৤ তাই ‎সে সময়ে আমার মনে হল এই অবসরে এখানকার ভাষা ওডিয়া কিছুটা শিখে ‎ফেলি৤ সেই অনুসারে বাংলার মাধ্যমে ওডিয়া শেখার চটি বই কিনে ফেললাম৤ ‎পড়ে বেশ এগোচ্ছিলাম৤ বেশ অনেকটা পড়তে পারছিলাম৤ কিন্তু সরল ‎বর্ণসমাবেশ পেরিয়ে যখন যুক্তবর্ণে প্রবেশ করলাম তখন পড়লাম অগাধ জলে৤ ‎প্রতিটি যুক্তবর্ণই যেন আলাদা আলাদা হরফ৤ সহজ তো নয়ই, আত্মস্থ করা খুব ‎কঠিন হল৤ শেষে বাধ্য হলাম পড়া ছেড়ে দিতে৤ বলা যায় ড্রপআউট হয়ে ‎গেলাম৤ বাংলা শিখতে গিয়ে, বাংলার শিশুরা জটিল দলা পাকানো যুক্তবর্ণ ‎শিখতে গিয়ে কি এমনি ড্রপআউট হয় না? যে পরিবারে প্রথম-প্রজন্ম লেখাপড়া ‎শিখতে স্কুলে গেছে, সেখানে কে তাকে সাহায্য করবে? বাংলার জটিল দলা ‎পাকানো যুক্তবর্ণ শিখতে গিয়ে শিশুরা অবশ্যই এমনি ড্রপআউট হয়৤ ইংরেজি ‎মাধ্যমে পড়া একটি ভালো বাঙালি ছাত্রের আক্ষেপে মূল সুরটি ধরা পড়েছে-- “উঃ, ‎বাংলাটা কী কঠিন!” স্কুলছুট বা শিক্ষাছাড় তথা ড্রপআউটের একটি কারণ হয়ে ‎আছে বাংলা যুক্তবর্ণ৤ অবঙ্গভাষী বা বিদেশিদের কথা এপ্রসঙ্গে মনে রাখলে ‎ব্যাপারটি যে আরও কত বিরাগজনক(repelling) তা সহজে বোঝা যাবে৤ ‎
মাতৃভাষায় যার যত দখল কম তার মেধা বা প্রতিভার বিকাশ ততো ‎সংকুচিত হয়৤ বাংলাভাষা যেহেতু সঠিক জীবিকা দিতে পারে না, তাই সম্পন্ন ‎পরিবারের শিশুরা ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে প্রেরিত হয়৤ যাতে তার জীবিকার ক্ষেত্র ‎সুবিস্তৃত হয়৤ ইংরজি সে শিখুক, মাতৃভাষার মতো করেই শিখুক, কিন্তু ‎মাতৃভাষার দখল পুরোপুরি থাকা দরকার তবে তার মেধা বা প্রতিভার সঠিক ‎বিকাশ হবে৤ মাতৃভাষায় মনের ভাব যেরকম করে প্রকাশ করা যায়, তা অন্য ‎ভাষায় করা যায় না৤ অন্য ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতে হলে প্রথমে ‎মাতৃভাষায় বিষটি নিয়ে মনে মনে বক্তব্য গুছিয়ে নিয়ে মানসিভাবে তা সেই ‎বিদেশি ভাষার তাৎক্ষণিক অনুবাদ করে নিয়ে প্রকাশ করতে হয়৤ তা অতি ‎তাৎক্ষণিক(instant) হতে পারে, সেজন্য হয়তো মনে হতে পারে যে, তা ‎বিদেশি ভাষাতেই সরাসরি বলা হল, কিন্তু মনে মনে মানসিক অনুবাদ হতেই ‎থাকে৤ মনে মনে না গুছিয়ে কিছু বলা যায় না, মনের “ভাব” মাতৃভাষায় প্রকাশ ‎মানেও তো তা “ভাষায়” অনুদিত হচ্ছে-- ‘ভাবটি’ ভাষায় অনুদিত হচ্ছে৤ শিশুরা ‎ভাব গোছাতে পারে না বলেই অসংলগ্ন কথা বলে৤ যতই দিন যায়, বয়স বাড়ে-- ‎মাতৃভাষায় দক্ষতা বাড়ে, ততোই শিশু তার কথা গুছিয়ে বলতে পারে৤ পর-ভাষায় ‎বা বিদেশি ভাষায় মানুষ চিরকাল শিশু, তথা শিক্ষার্থী থেকে যায়৤ এই ‘ভাব’ ‎গোছানো মানে তা অতি তাৎক্ষণিক ‘মুখের ভাষায়’ অনুদিত হওয়া-- তা সে ‎মাতৃভাষায় হলেও! মাতৃভাষায় যার যত দক্ষতা, যার যত অনুশীলন সে ততো ‎সুচারুভাবে তার মনের ‘ভাব’ প্রকাশে সফল হবে৤ যদিও মাতৃভাষা হলেই সকলকিছু ‎সুন্দরভাবে প্রকাশ করা যায় না, মাতৃভাষাও গভীরভাবে অনুশীলন করা দরকার৤ ‎সাহিত্য যাঁরা রচনা করেন, তাঁরা সকলে সমান সফল নন, এর কারণও সেই একই, ‎কেউ সুন্দরভাবে তা প্রকাশ করতে পারেন, কেউ সুন্দরতরভাবে তা পারেন৤ ‎হাত, পা, আম, জাম কাঁঠাল, বলতে পারলেই সব ভাব প্রকাশ করা যায় না--বিমূর্ত ‎ভাব প্রকাশ করা যায় না৤ সকল ভাষায় থাকে শব্দের তিন স্তর (১)মূর্ত শব্দ-- ‎হাত, পা, আম, জাম কাঁঠাল, (২)অর্ধমূর্ত শব্দ-- দাদা, কাকা, বাবা, মা, পিসি, ‎মাসি, মেসো, নতুনদাদা, (৩)বিমূর্ত শব্দ-- স্নেহ, ভালোবাসা, দয়া, উচ্ছ্বাস, গরিব, ‎তেজ ইত্যাদি৤ ভাষা যে-যত অনুশীলন করবে সে ততো বিমূর্ত শব্দে সমৃদ্ধ ‎হবে, এবং ততোই সে মনের ভাবসমূহ প্রকাশে দক্ষ হবে৤ যে ভাষায় বিমূর্ত শব্দ ‎যত বেশি, সে ভাষা ততো সমৃদ্ধ৤ ‎
অনেক ইংরেজি শব্দের যেমন বাংলা হয় না, তা ইংরেজি করেই প্রকাশ ‎করা সহজ, তেমনি মাতৃভাষার অনেক ভাব ইংরেজি করে বলা খুব কঠিন, ‎অনুবাদ করে তা মোটামুটি কাছাকাছি করা সম্ভব৤ এজন্য কবিতার সঠিক অনুবাদ ‎হয় না, যেটা হয় সেটা মোটামুটি ভাবানুবাদ৤ এমনকি তেমন বৈভবসম্পন্ন গদ্য ‎হলেও তার সঠিক অনুবাদ করা কঠিন৤ রবীন্দ্রনাথের “বাংলাভাষা- পরিচয়” বইটি ‎কম বয়স্ক তরুণদের জন্য রচিত, তার ভাষাও বেশ সরল, কিন্তু ঠিক যেন তা ‎সমুদ্র-বেলাভূমির মতো, জলে বহু দূর গেলেও হাঁটু ডোবে না, কিন্তু এগোতে ‎এগোতে একটু একটু করে এক সময়ে আর তল পাওয়া যায় না৤ সেখানে সুচারু ‎অনুবাদ হবে কেমন করে? কোন একটি বিশেষ শব্দ নয়, সামগ্রিক ভাবটি যেন ‎চেতনাকে মোহমুগ্ধ করে রাখে৤ ‎

বাংলা যুক্তবর্ণের সূত্র হবে দুটি 

(১)


(২)

এখানে c বা C ‎হল consonant তথা ব্যঞ্জনবর্ণ৤ c1 হল ছোট আয়তনের বর্ণ, আর C2 হল বড় ‎আয়তনের বর্ণ৤ প্রথম সূত্রটিতে বোঝানো হচ্ছে দুই বর্ণের মিলন, তার প্রথমটি ‎ছোট মাপের হরফ, আর দ্বিতীয়টি বড় মাপের হরফ৤ এবং দ্বিতীয় সূত্রটিতে ‎বোঝানো হচ্ছে তিন বর্ণের মিলন, তার প্রথম দুটি ছোট মাপের হরফ, আর ‎শেষেরটি বড় মাপের হরফ৤ এখানে ইংরেজিতে  মাপটি ঠিক যেমন গঠনের, বাংলায় যুক্তবর্ণের হরফ ‎যোজনাও ঠিক তেমনি ধরনের হবে৤ ‎ইংরেজি হরফে মাত্রা নেই, বাংলা হরফে মাত্রা আছে, এখানে বাংলায় ছোট বড় মাপের দুটি হরফই পাশাপাশি বসবে এবং দুটির মাত্রাই একই রেখায় হবে৤

-----বাংলায় চার বর্ণের মিলন প্রকৃতপক্ষে গিয়ে দাঁড়ায়, ‎তিন বর্ণেরই হেরফের৤ এ সবের উদাহরণ দেখা যাক--‎ ‎(১)c1C2 -- ক্‍+ক ক্ক পাক্কা, ঙ্‍+গ ঙ্গ বঙ্গ, ট্‍+ট ট্ট পাট্টা৤
‎‎(২)c1c1C2 -- ন্‍+দ+র=ন্দ্র চন্দ্র, স্‍+প্‍+ল স্প্ল স্প্লেনডিড, স্প্লিট৤ ‎
এই রীতিতে চলতি অভ্যাসে বেশ কিছুটা ধাক্কা লাগবে, কিন্তু দলাপাকানো ‎হরফের চেয়ে তা অনেক সহজ হবে৤ মণ্ড হরফের জটিলতা এতে অপসারিত ‎হয়ে তা সহজবোধ্য হবে৤ ‎
এই রীতির একটা বড় সুবিধা হল এই যে যাঁরা বাংলা কম্পিউটার ফন্ট ‎নির্মাণ করতে চান তাঁরা অনেক সহজে সকল যুক্তবর্ণকে নিয়ন্ত্রণ করতে ‎পারবেন৤ ভবিষ্যতে যদি অন্য ভাষা থেকে আগত ধ্বনির জন্য নতুন নতুন যুক্তবর্ণ ‎লিখতে হয় তবুও তা সহজে লেখা যাবে, ফন্ট সফ্‌টওয়্যার সংশোধন করতে ‎হবেনা৤ দলা পাকানো হরফমণ্ড তৈরি করতে হবে না৤ কারণ এই রীতির ‎পরিসর সুদূর বিস্তৃত, সেখানে বিচরণ করা যাবে অবাধে৤ ফন্ট সফ্‌টওয়্যার হবে ‎অনেক কম আয়তনের, এবং নির্মিতিতে অপেক্ষাকৃত অনেক সহজ, সরল৤ দেখা ‎যাচ্ছে চলতি বাংলা ইউনিকোড ফন্টে যেখানে মণ্ড যুক্তবর্ণ ব্যবহার করা ‎হয়েছে, সেগুলি ৩ থেকে ৬গুণ বেশি বড় হয়৤ এই উদ্দিষ্ট ফন্টের আয়তন ৮৮ কেবি, ‎আর অন্য ফন্টের আয়তন ২২৭ কেবি থেকে ৪৭৮ কেবি, বা কিছু কমবেশি৤ ‎
দেখা যাক বাংলা যুক্তবর্ণ কেমন গঠনের হবে-- ‎
দুই বর্ণ:--‎
ক্ক, ক্ট, ক্ত, ক্ন, ক্ম, ক্য, ক্র, ক্ল, ক্ব, ক্ষ, ক্স, খ্ম, খ্য, ক্র, গ্দ, গ্ধ, গ্ন, গ্ম, গ্য, গ্র, ‎গ্ল, গ্ব, ঘ্ন, ঘ্য, গ্র, ঘ্ব, ঙ্ক, ঙ্খ, ঙ্গ, ঙ্ঘ, ঙ্ম, চ্চ, চ্ছ, চ্ঞ, চ্য, ছ্য, জ্জ, জ্ঝ, জ্ঞ, ‎জ্য, জ্র, জ্ব, ঞ্চ, ঞ্ছ, ঞ্জ, ঞ্ঝ, ঞ্য, ট্ট, ট্ম, ট্য, ট্র, ট্ব, ঠ্ব, ড্ড, ড্ম, ড্য, ড্র, ড্ব, ফ্য, ‎ঢ্র, ণ্ট, ণ্ঠ, ণ্ড, ণ্ঢ, ণ্ণ, ণ্ম, ণ্য, ণ্ব, ত্ত, ত্থ, ত্ন, ত্ম, ত্য, ত্র, ত্ব, থ্য, থ্র, থ্ব, দ্গ, দ্ঘ, ‎দ্দ, দ্ধ, দ্ভ, দ্ম, দ্য, দ্‌য, দ্র, দ্ব, ধ্ন, ধ্ম, ধ্য, ধ্র, ধ্ব, ন্ট, ন্ড, ন্ত, ন্থ, ন্দ, ন্ধ, ন্ন, ন্ম, ‎ন্য, ন্ব, ন্স, প্ট, প্ত, প্ন, প্প, প্য, প্র, প্ল, প্স, ফ্র, ফ্ল, ব্জ, ব্দ, ব্ধ, ব্ব, ব্ল, ভ্য, ভ্র, ‎ভ্ল, ম্ন, ম্প, ম্ফ, ম্ব, ম্ভ, ম্ম, ম্য, ম্র, ম্ল, য্য, র্‍, র্ক, র্খ, র্গ, র্ঘ, র্চ, র্ছ, র্জ, র্ঝ, র্ট, র্ড, ‎র্ণ, র্ত, র্থ, র্দ, র্ধ, র্ন, র্প, র্ফ, র্ভ, র্ম, র্য, র্র, র্ল, র্ব, র্শ, র্ষ, র্স, র্হ, ৎর্‍ , ল্ক, ল্গ, ল্ট, ল্ড, ‎ল্প, ল্ফ, ল্ম, ল্য, ল্ল, ল্ব, ব্য, ব্র, শ্চ, শ্ছ, শ্ন, শ্ম, শ্য, শ্র, শ্ল, শ্ব, ষ্ক, ষ্ট, ষ্ঠ, ষ্ণ, ‎ষ্প, ষ্ফ, ষ্ম, ষ্য, ষ্ব, স্ক, স্খ, স্ট, স্ত, স্থ, স্ন, স্প, স্ফ, স্ম, স্য, স্র, স্ল, স্ব, হ্ণ, ‎হ্ন, হ্ম, হ্য, হ্র, হ্ল, হ্ব, ড়্গ৤ = ২১১টি৤ ‎




এখানে দ্‌য এবং ঋর্‍ -- এই দুটি গণনা থেকে বাদ, কারণ দ্য [দ+য=দ্‌য]একবার ‎গণনা করা হয়েছে৤ ঋর্‍ যুক্ত বর্ণ নয়, কারণ এখানে স্বরবর্ণে ব্যঞ্জনবর্ণ যুক্ত ‎হয়েছে৤ র+ঋ র্+ঋ র্‍ +ঋ=ঋর্‍৤ যেমন কা, কৃ, কো এগুলি যুক্তবর্ণ নয়৤ ‎বিভ্রান্তি হবার কারণ হল র-বর্ণটি রেফ চিহ্ন হয়ে ঋ-এর উপরে বসেছে৤ ‎

তিন বর্ণ:-- ‎
ক্ট্র, ক্ত্য, ক্ত্র, ক্ন্য, ক্যং, ক্রং, ক্ল্য, ক্ষ্ণ, ক্ষ্ম, ক্ষ্য, ক্ষ্ব, ক্ষং, ক্ষঃ, ক্ষঁ, গ্ধ্য, গ্ন্য, গ্নং, ‎গ্র্য, ঘ্ন্য, ঙ্ক্য, ঙ্ক্র, ঙ্ক্ষ, ঙ্খ্য, ঙ্গ্য, ঙ্গঃ, ঙ্ঘ্য, ঙ্ঘ্র, ঙ্ঘঃ, চ্চঃ, চ্ছ্র, চ্ছ্ব, জ্জ্ব, ণ্ঠ্য, ণ্ড্য, ‎ণ্ড্র, ত্ত্য, ত্ত্র, ত্ত্ব, ত্ন্য, ত্ম্য, ত্যং, ত্র্য, ত্রং, দ্দ্য, দ্দ্ব, দ্দং, দ্ধ্য, দ্ধ্র, দ্ধ্ব, দ্ভ্র, দ্যঃ, দ্র্য, ‎দ্রং, দ্ব্য, দ্বং, ধ্বং, ন্ট্র, ন্টং, ন্ড্র, ন্ত্য, ন্ত্র, ন্ত্ব, ন্তঃ, ন্দ্য, ন্দ্র, ন্দ্ব, ন্দং, ন্দঃ, ন্ধ্য, ন্ধ্র, ‎ন্ধঃ, ন্ন্য, প্ত্র, প্রং, ফ্রঁ, ব্ধ্য, ব্ধ্র, ব্বঃ, ব্ভ্র, ব্রঁ, ব্ল্য, ভ্যং, ভ্রং, ম্প্য, ম্প্র, ম্পং, ম্ব্র, ম্ভ্র, ‎ম্ভঃ, র্ক্ত, র্ক্য, র্গ্য, র্গ্র, র্ঘ্য, র্ঙ্গ, র্চ্ছ, র্চ্য, র্চঃ, র্জ্ঞ, র্জ্য, র্জঃ, র্ট্র, র্ঢ্য, র্ণ্য, র্ণঃ, র্ত্ম, র্ত্য, র্ত্র, ‎র্থ্য, র্থং, র্দ্ধ, র্দ্য, র্দ্র, র্দ্ব, র্দঃ, র্ধ্য, র্ধ্ব, র্ধং, র্প্য, র্পঃ, র্ব্ভ, র্ভ্য, র্ভং, র্ম্য, র্মং, র্লং, র্ব্য, র্বং, ‎র্শ্য, র্শ্ব, র্শঃ, র্ষ্ট, র্ষ্ণ, র্ষ্য, র্স্ট, র্স্য, র্সঃ, র্হঃ, ল্ক্য, ল্প্য, ব্যং, শ্চ্য, শ্বঃ, ষ্ক্র, ষ্ক্ব, ষ্ট্য, ‎ষ্ট্র, ষ্টং, ষ্ঠ্য, ষ্ঠং, ষ্ণ্য, ষ্প্র, ষ্ম্য, স্ক্র, স্ট্র, স্টং, স্ত্য, স্ত্র, স্ত্ব, স্তঁ, স্থ্য, স্ন্য, স্প্র, ‎স্প্ল, স্ফং, স্রং, স্বঃ, হ্ম্য = ১৬৮টি৤ ‎







চার বর্ণ:--‎
ক্ষ্ণ্য, ক্ষ্ম্য, ঙ্ক্ষ্য, ত্র্যং, দ্ব্যং, ন্ত্যং, ন্ত্র্য, ন্দ্রং, ন্ধ্যং, র্দ্ধ্ব, র্দ্ধং, র্ব্ভ্য, র্ষ্ণ্য, স্ট্রং, স্ত্রং, ‎স্প্রং = ১৬টি৤ ‎





দুই বর্ণ=২১১, তিনবর্ণ=১৬৮, চার বর্ণ=১৬৤ সর্বমোট=২১১+১৬৮+১৬=৩৯৫টি৤

যুক্তধ্বনি আর যুক্তবর্ণ ঠিক এক জিনিস নয়৤ যুক্তবর্ণ হলেই যে তা যুক্তধ্বনি ‎হবে এমন নয়, তবে সকল যুক্তধ্বনিই যুক্তবর্ণ৤ যেখানে ধ্বনি সান্দ্র তথা তা ‎বিশ্লিষ্ট করে বলা, বা লেখা যাবে না সেটাই হল যুক্তধ্বনি, তথা সান্দ্রধ্বনি, তার ‎তালিকা নীচে দেখানো হল:-- ‎
ক্ন, ক্‍র ক্ল খ্ম খ্‍র গ্‍র গ্ল ঘ্ন ঘ্‍র চ্চ জ্‍র ট্‍র ড্‍র ত্ত ত্‍র থ্‍র দ্‍র ধ্ধ ধ্ম ধ্‍র ন্‍র প্‍র ‎প্ল ফ্‍র ফ্ল ব্‍ব ব্‍র ব্ল ভ্‍র ভ্ল ম্‍র ম্ল রর ল্‍র শ্ট শ্ট্‍র শ্ন শ্ল শ্শ স্ক স্ক্‍র স্খ স্ত ‎স্ত্‍র স্থ স্ন স্প স্প্‍র স্প্ল স্ফ স্ম স্ম্‍র স্‍র স্ল হ্‍র হ্ল ‎
‎= ৫৬টি৤ ‎
পাদ্রি জন মারডকের কথা কিছু বলা দরকার৤ ইংরেজ পাদ্রি জন মারডক ‎১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগরকে বাংলা বানান সংস্কারের এক সুলিখিত প্রস্তাব ‎দিয়েছিলেন (Letter to Babu Iswarchandra Vidyasagar on Bengali ‎typography.)৤ তার দশ বছর আগে ১৮৫৫-তে ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা [বিদ্যাসাগর] তাঁর ‎বর্ণপরিচয় প্রকাশ করেন৤ “বাংলা ভাষা শিক্ষা ও বাংলা মুদ্রণ সহজতর করার ‎জন্য ক্রিশ্চিয়ান ভার্নাকুলার এডুকেশন সোসাইটির এজেন্ট পাদ্রি জন মার্ডকের ‎ভাবনা ও প্রযত্নের কথা এখানে উল্লেখ্য৤ স্কুলপাঠ্য বই প্রকাশনায় দীর্ঘকাল ‎যুক্ত থেকে তিনি বাংলাভাষার প্রয়োগকৌশলগত যে সব অসুবিধার সম্মুখীন হন ‎তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি বিদ্যাসাগরকে লেখা একটি ‎খোলা চিঠিতে বাংলা অক্ষর সংস্কারের কয়েকটি প্রস্তাব করেন৤” (বাংলা ‎মুদ্রণের চার যুগ-- বরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, দুই শতকের বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশন--‎আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা, পৃঃ-১০০)৤ মারডক তাঁর চিঠিতে বাংলাভাষার জন্য ‎যে প্রস্তাব দেন তা বিদেশির নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখা বাংলাভাষার জন্য এক ‎দূরপ্রসারী গতিশীল উন্নয়ন প্রস্তাব৤ যদিও সে প্রস্তাব অনুসারে সেকালে ‎কোনও সংস্কারই করা হয়নি, তবু তা এযুগেও অস্বীকার করা যায় না, বরং এযুগে ‎সে ধরনের প্রয়াসই যুক্তিশীল মানুষকে টানছে৤ মারডক (Murdoch) জানতেন ‎যে তাঁর এই প্রস্তাব হয়তো গ্রহণ করা হবে না, তাই তিনি এটাও বলেন যে, ‎‎"Though the proposal may now be treated with ridicule(পরিহাস), its ‎adoption is a mere question of time." (ঐ)৤ প্রস্তাবটি অবশ্য সরাসরি বানান ‎সংস্কারের দিকে লক্ষ করে করা না হলেও, বাংলা ভাষার লিখন ও ছাপাকে তা ‎প্রভাবিত করবে, আরও হয়তো সময় লাগবে, তবে তা হবেই৤ বাংলা লাইনো ‎ছাপায় তা বহুল পরিমাণে গ্রহণ করা হয়েও ছিল, কিন্তু অতি আধুনিক ছাপার ‎পিটিএস বা ডিটিপিতে এসে তা আবার ফিরে গেছে সেই নিজ নিকেতনে-- ‎হাতে ছাপার কুক্ষিতে৤ ‎
বিদেশিরা আমাদের জন্য নানা বিষয়ে চেষ্টা করে গেছেন, কিন্তু আমরা ‎তা সঠিকভাবে অনেক সময় গ্রহণ করতে পারিনি৤ ফলে আমাদের অবস্থানে ‎পরিবর্তন হয়নি, জড়তা কাটেনি৤ বাংলা ছাপার দিকে একটু নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে ‎তাকালে, নবাগত বা বিদেশির দৃষ্টি নিয়ে তাকালে, বাংলা ছাপার অসহায় বিস্রস্ত ‎রূপটি চোখে পড়বে৤ ছাপার খারাপ মানের কথা বলছি না, হরফ যোজনার বিকট ‎চেহারা, হরফের উপরে হরফ, তার উপরে রেফ, আর এদিকে হরফের নীচে নানা ‎চিহ্ন৤ এছাড়া লিপির নিজস্ব হাত পা বিস্তার তো আছেই৤ সেটা তো অমোঘ ‎অপরিবর্তনীয়, বর্ণযোজনাকালে সেগুলি আবার নিজেদের মধ্যে জড়াজড়ি করে ‎কী কাণ্ড! তবু আমরা চোখ বুঁজে থাকি৤ স্বাবলম্বী হবার প্রয়াস তেমন চোখে ‎পড়ে না৤ ‎
বাংলা ছাপার সূচনা, বিকাশ ও প্রসারে ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড ও ‎চার্লস উইলকিনস এই দুজন বিদেশি এবং তাঁদের সহযোগী একজন দেশি মানুষ ‎পঞ্চানন কর্মকার স্মরণীয় হয়ে রইলেন৤ একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে সামনে ‎কোনও পূর্ব-উদাহরণ না থাকা সত্বেও পঞ্চানন অপূর্ব দক্ষতায় টাইপ নির্মাণ ‎করেছিলেন৤ একে শুধু নির্মাণ না বলে বলা উচিত সৃষ্টি৤ ছাপাখানার টাইপ ‎নির্মাণ পঞ্চাননের জীবিকা হয়ে উঠেছিল, এবং পঞ্চানন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মে ‎‎(১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি পরলোক গমন করেন) এই প্রবাহ সঞ্চালন করে ‎দিয়েছিলেন৤ তাঁর জামাই মনোহর মিস্ত্রি, ও পরবর্তীতে মনোহরের পুত্র ‎কৃষ্ণচন্দ্র মিস্ত্রি মুদ্রণ শিল্পের এই দক্ষতার ধারা বজায় রেখেছিলেন৤ ‎পঞ্চাননের চেয়ে তাঁর জামাই মনোহর আরও বেশি দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন, এবং ‎মনোহরের পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র অতীব দক্ষতা অর্জন করেন৤ কৃষ্ণচন্দ্র দীর্ঘজীবী হননি, ‎তিনি কলেরায় মারা যান ১৮মে, ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে৤ তখনও তাঁর মা এবং স্ত্রী ‎বেঁচে৤ “১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের ১৮মে, শ্রীরামপুরে প্রায় তেতাল্লিশ বছর বয়সে ‎নিঃসন্তান কৃষ্ণচন্দ্র বিসূচিকা রোগে পরলোক গমন করেন৤ তখন তাঁর মাতা ও ‎পত্নী উভয়েই জীবিত ছিলেন৤”(প্রবীর সরকার-- দুই শতকের বাংলা মুদ্রণ ও ‎প্রকাশন, পৃঃ-৮৭)৤ ‎
শোনা যায় পঞ্চাননের একটি মূর্তি বসানো হয়েছে শ্রীরামপুরে, কিন্তু ‎তাঁদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে বই প্রকাশ করা দরকার৤ নয়তো নবযুগের ‎সূচনাকারী আমাদের ক্যাক্সটন, গুটেনবার্গ অচেনার অন্ধকারে থেকে যাবেন৤ ‎তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ঘাটতি থেকে যাবে, যা আমাদের গৌরব বৃদ্ধি করবে না৤ ‎
এঁদের পদবি দেখে মনে হয় এঁরা সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গীয় মানুষ ‎ছিলেন, তাঁদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও সামাজিক ভূমিকায় তাঁরা বাংলার মুদ্রণ তথা ‎বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে যে অপরিমেয় অবদান রেখেছেন সেজন্য ‎তাঁরা আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন, ভবিষ্যতেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন৤ ‎
আগে উল্লেখ করা হয়েছে ছাপার কালির সঙ্গে পবিত্র গঙ্গা জল মিশিয়ে ‎ছাপা শুরু করাতে ধর্মীয় গোঁড়ামি কমেছিল৤ এ ঘটনায় মনে হয় সে যুগে বিদেশি ‎‎“ম্লেচ্ছরা” ছাপা নামক এই “অপবিত্র” কাজে নিম্নবর্গীয় মানুষ ছাড়া কাউকে ‎পাননি তাঁদের সহায়তা করার জন্য৤ কারণ দেশের মানুষ এই লাল মুখো সাদা ‎চামড়ার বিদেশি মানুষদের ঘৃণার চোখে দেখত, ভয়ও পেত, যদি তাঁদের ধর্মনাশ ‎করে দেয়৤(একটি প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি-- “কেরি ও টমাস নিতান্ত মর্মাহত হয়ে ‎পড়লেন। প্রথমত এবং প্রধানত তাঁরা খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য এ দেশে ‎এসেছেন৤”)‎
‎ আমরা ইচ্ছে করলে-- দরকার=দর্কার, সরকার=সর্কার, উল্টা=উলটা, ‎পাল্টা=পালটা, সবজি=সব্জি, কোন্‌টা=কোন্টা ইত্যাদি লিখতে পারি৤ পারি ‎কারণ এখানে যুক্তধ্বনি হয়নি, কিন্তু যেখানে যুক্তধ্বনি হবে সেখানে ইচ্ছে ‎করলেও এভাবে লেখা যাবে না৤ সেখানে যুক্তবর্ণ করেই লিখতে হবে৤ যেমন-- “‎বিস্তর পুস্তক দোস্তকে সস্তায় গস্তায়৤” এখানে ইচ্ছে করলেই লেখা যাবে-- “‎বিস্‌তর পুস্‌তক দোস্‌ত‌কে সস্‌তায় গস্‌তায়৤” আবার ইচ্ছে করলে, ‘বিসতর ‎পুসতক দোসতকে সসতায় গসতায়’-- এভাবেও লেখা চলতে পারে৤ এখানে ‎যুক্তধ্বনি হয়নি বলেই এটা করা সম্ভব৤ কিন্তু যুক্তধ্বনি হলে সেটা করা যাবে ‎না৤ যেমন-- “স্তরে স্তরে স্তম্ভিত মেঘস্তূপ”৤ এখানে ইচ্ছে করলেও, “স্‌তরে ‎স্‌তরে স্‌তম্‌ভিত মেঘস্‌তূপ”, লেখা চলে না৤ এখানে যুক্তধ্বনি হয়েছে বলেই ‎এটা করা সম্ভব নয়৤ এরকম অবিভাজ্য যুক্তধ্বনিকে বলা যাবে সান্দ্রধ্বনি৤ ‎
বাংলায় এমনি সান্দ্রধ্বনি আছে প্রায় ৫৬টি, সেকথা আগেই উল্লেখ করা ‎হয়েছে৤ তবে সেখানে যেভাবে এর উপস্থাপনা করা হয়েছে তা সবটা ঠিক ‎চলতি রীতি নয়৤ “বাংলা নতুন-বানান” কেমন হবে সে কথা আলোচনা করতে ‎গিয়ে এগুলি সেখানে আলোচনা করা হয়েছে[দেখুন, http://banglamagna.blogspot.com/ ‎‎‘বাংলামগ্ন’ ব্লগ, ডিসেম্বর, ২০০৯, অংশে]৤ তার কিছু হদিস এখানে দেখানো ‎গেল৤ তবে সান্দ্রধ্বনি বা যুক্তধ্বনিকে নতুন পুরানো কোনও অ‌বস্থাতেই ভেঙে বা ‎বিশ্লিষ্ট করে লেখা চলবে না৤ ‎
যাঁরা কম্পিউটার ব্যবহার করেন তাঁরা জানেন, একটি হরফ লিখতে হলে ‎একটি চাবি তথা ‘কি’(key) চাপতে হয়৤ একটি চাবিতে একটি হরফের সংকেত ‎থাকে৤ আমরা লিখব “ক”, সেজন্য নির্দিষ্ট চাবি চাপলাম৤ আবার ‘ক্’ লেখার ‎সময়ে ক লিখে হস্ চিহ্নের জন্য অন্য আর একটি চাবি চাপলাম, তাই হল ‘ক্’৤ ‎এই হস্ চিহ্ন ব্যবহার করলে বর্ণটির ধ্বনি হলন্ত বা ব্যঞ্জনান্ত হয়, অর্থাৎ ‎বর্ণটির ধ্বনি-সংক্ষেপ বোঝায়৤ আমরা লিখতে পারি “শক্‌ত”, আবার লিখতে পারি ‎‎“শক্ত”৤ ‘শক্‌ত’ লেখার সময়ে আমরা কম্পিউটারকে সংকেত দিলাম যে ‘ক’ ‎আর ‘ত’ দুটি বর্ণ মিলে একত্র হয়ে যাবে না৤ আবার ‘শক্ত’ লেখার সময়ে ‎কম্পিউটারকে সংকেত দিলাম যে ‘ক’ আর ‘ত’ দুটি বর্ণ মিলে একটি যুক্তবর্ণ ‎হবে৤ কম্পিউটার সেই মতো সব কিছু করবে৤ আবার আমরা ‘ক’ আর ‘ষ’ ‎মিলিয়ে ক্ষ করার সময়ে কম্পিউটারকে সংকেত দিলাম যে ‘ক’ আর ‘ষ’ দুটি বর্ণ ‎মিলে একটি যুক্তবর্ণ হবে, আর তার রূপ করতে চাই একটি হরফমণ্ড৤ তখন ‎সফ্‌টওয়্যারে এমন সংকেত দেওয়া থাকে যে দুটি মিলে “ক্‍ষ” না হয়ে তা ‎হরফমণ্ড “ক্ষ” দেখাবে৤ যদি তা সাধারণভাবে “ক্‍ষ” হত, তবে তখন ‎সফ্‌টওয়্যারে জটিলতা কিছুটা কম হত৤ সুতরাং হাতে করে লেখার কালে ‎আমাদের যেমন মনে রাখতে হয় যে-- ক+ষ=ক্ষ হবে, তেমনি কম্পিউটারে লিখবার সময়ে ‎কম্পিউটারকেও সে কথা মনে রাখাতে হয়, নইলে তা হবে ‘ক্‍ষ’৤ এসব করতে ‎জটিলতা বাড়ে৤ তা কেবল যে হরফের চেহারায় জটিলতা তা-ই নয়, কম্পিউটার ‎সফ্‌টওয়্যারেও জটিলতা৤ এসব হল কম্পিউটারের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার৤এ ধরনের ‎অকারণ জটিলতা কমে যাবে যুক্তবর্ণ সরল করে লিখলে, যাকে বলা হয়েছে ‎‎‘স্বচ্ছ যুক্তবর্ণ’৤ ‎
আগে সব কিছু সাহিত্য ছিল পদ্যে বা কবিতায় রচিত৤ গদ্য ছিল না৤ পরে ‎ইংরেজ আমলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের উদ্যোগে বলা চলে বাংলা গদ্যের ‎উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে৤ উদ্ভব বলতে যদি সংকোচ হয়, বিকাশ যে হয়েছিল সে ‎কথা না মানার কোনওই অর্থ নেই৤ ‎
বিদেশিরা আমাদের ছাপাখানার সৃষ্টি করেছে, বিদেশিরা আমাদের গদ্যের ‎বিকাশ ঘটিয়েছে৤ আমরা এতটা বিদেশি নির্ভর হয়ে আর কতকাল থাকব? তাও ‎বিদেশি পাদ্রি জন মারডক বাংলা যুক্তবর্ণের লজিক্যাল বিন্যাস করার যে প্রস্তাব ‎দিয়েছিলেন, আমরা সেটা নেইনি৤ এখন অন্তত সেটা নতুন করে বিবেচনা করা ‎দরকার৤ জন মারডক প্রস্তাবিত পদ্ধতি ঠিক সেভাবে যদি নাও গ্রহণ করি, তার ‎সংশোধিত রূপ আমাদের অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে৤ এটা অবধারিত৤ ‎
উপরে যে বাংলা যুক্তবর্ণের সংশোধিত রূপ দেখানো হয়েছে, সে ব্যাপারটি ‎জ্ঞানচারী সুধীজনেরা বিবেচনা করে দেখুন৤ অন্তত কিছু উদ্যোগ নিতেই হবে৤ ‎আর আলুথালু বিস্রস্ত অবস্থায় বসে থাকার অর্থ হল অন্যদের থেকে পিছিয়ে ‎পড়া৤ সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সর্বশিখরে নিয়ে গেছেন, সে তো শতক ‎পেরিয়ে গেছে, আর কতকাল তা ভাঙিয়ে চলবে? এবার পরবর্তী উদ্যোগ না ‎নিলে বিপদ যে সামনে৤ কথায় বলে ‘কোন্ কালে খেয়েছি ঘি, আর একটু আঙুল ‎শুঁকে নি!’ কতকাল আমাদের আর ঘিয়ের গন্ধ শোঁকা চলতে থাকবে৤ ‎
কোনও দিন কি-- “সতরে সতরে সতমভিত মেঘসতূপ” লিখে পড়া এবং ‎বোঝা যাবে-- “স্তরে স্তরে স্তম্ভিত মেঘস্তূপ”৤ ইংরেজিতে তো হরফ ‎কেবলমাত্র পাশাপাশি বসিয়ে একাজ করা যায়, বাংলায় কবে তা করা যাবে? ‎বাংলায় এভাবে করা বা পড়ার প্রধান বাধা এই যে, বাংলা বর্ণমালা ইংরেজির মতো ‎পুরোপুরি এ্যালফাবেটিক(alphabetic) নয়, কিয়দংশে তা সিলাবিকও(syllabic) ‎বটে৤ ব্যঞ্জনবর্ণের প্রতিটি হরফের সঙ্গে একটি করে সহজাত(inherent) “অ” ‎ধ্বনি সংযুক্ত থাকে৤ তাই ‘ক’ কেবল ‘ক’ নয়, তা আসলে ক্+অ৤ ব্যঞ্জনবর্ণ বা ‎ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণ করা কঠিন, তাই প্রতিটি বর্ণের সঙ্গে একটি করে ‎অন্তর্নিহিত “অ” আছে৤ তাই তা সরাসরি ক খ গ ঘ এমনিভাবে পড়া বা ‎উচ্চারণ করা যায়৤ ইংরেজিতে ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের এই সংকট এড়ানো ‎হয়েছে প্রতিটি ব্যঞ্জনের একটি করে পৃথক নামকরণ করে৤ তাই, b=bi:(বি), ‎c=si:(সি), d=di:(ডি), f=ef(এফ) ইত্যাদি৤ ফলে ইংরেজি বর্ণমালা নিখুঁত ‎এ্যালফাবেটিক হতে পেরেছে, বাংলা তা হতে পারেনি৤ বাংলা এখনও মাঝপথে ‎দুয়ের মাঝখানে রয়ে গেছে-- না তা পুরো সিলাবিক(syllabic), না পুরো এ্যালফাবেটিক(alphabetic)৤ যেদিন বাংলা বর্ণমালা সম্পূর্ণরূপে এ্যালফাবেটিক ‎হয়ে উঠবে সেদিন “স্তরে স্তরে স্তম্ভিত মেঘস্তূপ” অনায়াসে লেখা যাবে-- ‎‎“সতরে সতরে সতমভিত মেঘসতূপ” কিন্তু পড়া হবে-- “স্তরে স্তরে স্তম্ভিত ‎মেঘস্তূপ”৤ তখন ব্যঞ্জনবর্ণে সহজাত অ-ধ্বনি সক্রিয় না থাকায় হয়তো ‎প্রয়োজনীয় স্থলে কখনও কখনও অ-এর(৹) চিহ্ন ব্যবহার করতে হবে৤ অ-এর ‎জন্য বহিঃচিহ্ন হবে, অ=৹ ‎
যেমন-- ‎
অম৹ল=যা ম্লান নয়, নাম৤ অমল৹= টক
কম৹ল=পদ্ম, কমল৹=কমিল৤ ‎
সর৹ল=সহজ, সরল৹=সরে গেল
‎ ‎ ইত্যাদি৤
 ‎
বাংলায় স্বরবর্ণ আছে ১১টি, এর ১০টির স্বরচিহ্ন বা কারচিহ্ন আছে৤ যেমন-- ‎া ি ী ু ূ ৃ ে ৈ ো ৌ, কেবল অ-এর কোনও স্বরচিহ্ন নেই৤ আসলে ‎আছে, তবে দৃশ্যত বা বাহ্য কোনও চিহ্ন নেই৤ এই বাহ্যত না থাকাই তার ‎উপস্থিতি প্রমাণ করছে৤ প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে সেটি সংপৃক্ত হয়ে আছে৤ ‎অ-ধ্বনি, তথা অদৃশ্য ও অলক্ষ্য অ-চিহ্ন প্রতিটি ব্যঞ্জনের সহজাত৤ অ-চিহ্ন অদৃশ্য বলে বাংলা লেখায় জটিলতা সেকারণে আর বাড়েনি, নয়তো বাংলা লেখা আরও যে কতই জটিল হত! বাংলা ‎বর্ণমালাকে অ-এর সাহজাত্য(inherence) থেকে বের করে এনে অ-কে বহিঃচিহ্ন হিসেবে ‎প্রয়োগ করতে হবে কখনও কখনও(সব সময়ে নয়)৤ তখন বাংলার আর হয়তো সত্যিই কোনও পিছুটান থাকবে ‎না৤ ‎

ইংরেজিতে স্বরবর্ণ ছাড়া কোনও শব্দ হয়না, বাংলায়ও তা-ই৤ কিন্তু গমন, ‎চলন, গরজ, কথন, সহজ, গরম ইত্যাদি শব্দে স্বরবর্ণ বা স্বরচিহ্ন কোথায়? ‎আছে৤ স্বরবর্ণ অ বা অ-ধ্বনি এর প্রতিটি হরফে হরফে, সকলের সঙ্গে ওতপ্রোত ‎বা সহজাত৤ তাই অ-এর সাহজাত্য বর্জিত অবস্থা যে ঠিক কেমন হবে তা এই ‎মুহূর্তে অনুমান করা একটু কঠিন৤ ‎

[Windows7, এবং Office Word7 environment-এ পড়লে সবটা ঠিক ঠিক পড়া যাবে৤
ফন্ট-- অহনলিপি-বাংলা১৪(AhanLipi-Bangla14)]

‎===‎
ঋণ:‎
বহু গ্রন্থ, পত্র পত্রিকা, অভিধান থেকে নানাভাবে সহায়তা গ্রহণ করা হয়েছে৤ ‎তাঁদের সকলের কাছে মুক্তকণ্ঠে ঋণ স্বীকার করি ও প্রণতি জানাই৤ ‎

‎ ‎
১৭/০৯/২০১০ ‎

(সর্ব শেষ পরিমার্জন ১৬/০৪/২০১৬)

--০০--









কোন মন্তব্য নেই: